অত্যাবশ্যকীয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্য আমদানিতে শুল্ক্ক নেই। এর উদ্দেশ্য, বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় রাখা। বাস্তবতা হচ্ছে, নিত্যপণ্য আমদানিতে শুল্ক্কমুক্ত সুবিধার সুফল মিলছে না। শুল্ক্কমুক্ত আমদানি ও শুল্ক্কছাড় থাকার পরও কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাজারকে অস্থির করে তোলে। মূলত এই সুবিধা যাচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর পকেটে। এ কারণে সরকার প্রতিবছর হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
শুল্ক্ক সুবিধার পাশাপাশি আমদানিতে সুদের হার ও এলসি মার্জিন কমানোর পরও অনেক সময় ফল পাওয়া যায় না। বর্তমানে পেঁয়াজের দর এর বড় উদাহরণ। পেঁয়াজ আমদানিতে আগে থেকেই শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষে ভারত রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিতেই এর দাম এক লাফে কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে যায়। রপ্তানি বন্ধের আগে ভারত নূ্যনতম রপ্তানি মূল্য বাড়িয়েছিল। ওই বর্ধিত দরে আমদানি করে বাজারে ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। আগে থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম হঠাৎ এভাবে বাড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্যায্য মুনাফা ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০১৭ সালে বন্যার কারণে চালের সরবরাহ কমে গেলে ২৮ শতাংশ আমদানি শুল্ক্ক প্রত্যাহার করেও বাজারে দাম কমানো যায়নি। পরে দেশে বাম্পার ফলন হলে চালের দাম কমে।
পেঁয়াজের বাজারের অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারের অনুরোধে গত ২ অক্টোবর পেঁয়াজ আমদানিতে সুদহার কমিয়ে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোকে এলসি মার্জিন বা এলসি খোলার সময় নূ্যনতম অর্থ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। এসব সুবিধায় বিকল্প দেশ, বিশেষত মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি শুরু হয়েছে। মিয়ানমার থেকে আমদানিতে খরচ হচ্ছে ৫০ টাকারও কম। অথচ বাজারে পেঁয়াজের দাম ১২০ থেকে ১৩০ টাকা।
বিশ্নেষকরা বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের তদারকি ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। এ-সংক্রান্ত যেসব আইন-কানুন রয়েছে সেগুলো তেমন কার্যকর নয়। তাদের মতে, শুধু শুল্ক্ক কমিয়ে ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ করা যাবে না। পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে হলে দেশের উৎপাদন, চাহিদা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শুল্ক্ককাঠামো যৌক্তিক করতে হবে। যুগোপযোগী আইন করতে হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৬ সালের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পেঁয়াজ, রসুন, ডালসহ ১৭টি পণ্যকে অত্যাবশ্যকীয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জনগণের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় থাকে বলে এগুলোকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য পণ্য হচ্ছে :ছোলা, শুকনা মরিচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনে, জিরা, হলুদ, তেজপাতা, ভোজ্যতেল, চিনি ও লবণ। এসব পণ্য আমদানিতে শুল্ক্ক নেই। এর বাইরে কিছু পণ্যে রেয়াতি হারে শুল্ক্ক রয়েছে। এনবিআরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, দেশের বাজারে এসব পণ্য যাতে সহজলভ্য হয় এবং সাশ্রয়ী দাম থাকে সে জন্য আমদানি পর্যায়ে শুল্ক্কছাড়ের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, নিত্যপণ্যের জন্য শুল্ক্কমুক্ত সুবিধা থাকা ভালো। তবে সময়ের প্রেক্ষাপটে যৌক্তিকীকরণ করতে হবে। সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহায়ক নীতি গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের এখানে নীতি হলো স্থির। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ একবার ব্যবস্থা নিয়ে বসে থাকে। পণ্যের দাম নিয়ে যখন হৈচৈ শুরু হয়, তখন তারা নড়েচড়ে বসে। মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে প্রাইস কমিশন গঠন করা হলে তা দিয়ে কার্যকর কিছু হবে না বলে মনে করেন তিনি।
বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে হৈচৈ শুরু হলে তখন খোলা বাজারে টিসিবি কম দামে পণ্য বিক্রি করে। কখনও কখনও পণ্য আমদানি করলেও সময়মতো সরবরাহ করতে পারে না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, টিসিবি দিয়ে কিছুই হবে না। সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া খুবই জটিল। পণ্যবাজারে সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হয়, যা টিসিবি দিয়ে সম্ভব নয়। ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণ করতে হলে ভারতের মতো পৃথক মন্ত্রণালয় করতে হবে। তা যদি না করা যায়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন আলাদা বিভাগ গঠন করা যেতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, উৎপাদন কাঠামোতে যে পরিবর্তন এসেছে, তাতে করে নিত্যপণ্যের বিদ্যমান শুল্ক্ক কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যখন যা দরকার অর্থাৎ অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত আসতে হবে তাৎক্ষণিক। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাজারে যখন কোনো পণ্যের ঘাটতি তৈরি হবে তখন শুল্ক্ক-কর কমিয়ে আমদানি বাড়াতে হবে। আবার আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হলে শুল্ক্ক বাড়িয়ে দিতে হবে। দেশের মধ্যে ওই পণ্যের উৎপাদন, চাহিদা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।
বর্তমানে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে খাদ্য পরিধারণ নামে একটি কমিটি আছে। এই কমিটি শুধু ধান-চালের (খাদ্যশস্য) বাজার পরিস্থিতি তদারক করে। গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, ধান-চালের পাশাপাশি এই কমিটির অত্যাবশকীয় পণ্যগুলোর উৎপাদন, সরবরাহ, মূল্য ইত্যাদি নিয়মিত তদারক করা উচিত।
তদারকি সেল শুধু নামেই :বাজার নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি উইং আছে, যার প্রধান যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। পরামর্শ ও বৈঠক ছাড়া এই কমিটির তেমন কোনো কাজ নেই। যে ধরনের দক্ষতা ও জনবল থাকা দরকার, এখানে তা নেই। ফলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন তদারকি সেল শুধু নামেই আছে। জানা যায়, বর্তমানে বাজার মনিটরিং টিমে ১১ জন সদস্য আছেন। এতে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধি, স্বরাষ্ট্র, পরিবেশ, সিটি করপোরেশনসহ পুলিশ বিভাগের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটির সদস্যরা প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, অতিরিক্ত মুনাফা করলে আইন অনুযায়ী জরিমানা করা হয়। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনের দুর্বলতার চেয়ে প্রয়োগের সমস্যা বেশি। ঢাকা শহরে কিছুটা তদারকি থাকলেও ঢাকার বাইরে জেলা শহরগুলোতে তা নেই। ডিসিদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পিত হলেও তা যথাযথভাবে পালন করা হয় না।
. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .
প্রকাশক: ফয়সাল আহাম্মেদ খান, সম্পাদক : জীবন খান, উপদেষ্টা : ডি আই জি আনোয়ার (অব:), মোহাম্মদ আমিমুল এহসান খান, আইন উপদেষ্টা : ফেরদৌস কবির খান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোঃ রাসেল কবির খান, বার্তা সম্পাদক: মোরশেদ আলম পাটোয়ারী, সিনিয়র সহ-সম্পাদক: সজীব হোসেন (জয়), সহকারি সম্পাদক: মোঃ জিল্লুর রহমান খান, সহকারি সম্পাদক: মোঃ ইমরান হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক : মতিউর রহমান (জনি), মফস্বল সম্পাদক: সঞ্জয় তালুকদার, এহতেশামুল হক (মাশুক), ক্রীড়া সম্পাদক : মোকাদ্দাস মোল্লা।
২৮/সি/৪ শাকের প্লাজা (টয়েনবি রোড) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল : ০১৭১৪-০২২৮৭৭, E-mail : jibonnews24@gmail.com
জীবন নিউজ ২৪ ডট কম লিমিটেড