আওয়ামী যুবলীগের বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ 'বুড়ো'রা কি বিদায় নিচ্ছেন? ক্যাসিনো ও দুর্নীতিবিরোধী সাম্প্রতিক অভিযান এবং সংগঠনের সপ্তম জাতীয় কংগ্রেস সামনে রেখে এ প্রশ্নটি এখন ঘুরেফিরেই আসছে। আগামী ২৩ নভেম্বর শনিবার সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে যুবলীগের কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হবে।
বেশ কিছু দিন ধরেই যুবলীগ নেতাদের বয়স নিয়ে নানামুখী মুখরোচক আলোচনা চলছে। অনেকেই বর্তমান কমিটির বুড়িয়ে যাওয়া নেতৃত্বের সমালোচনায় মুখর। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন মন্তব্য করা হচ্ছে। এ অবস্থায় ছাত্রলীগের মতো যুবলীগের নেতৃত্বে আসার বেলায় বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার গুজব-গুঞ্জন রয়েছে।
যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বয়স ৭১ পেরিয়েছে। ৩৫১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া সবাই ৬০ বছর পেরিয়ে গেছেন। কারও কারও বয়স ৭০-এর কোঠা ছাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ পাঁচজন কেন্দ্রীয় নেতাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী যাদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে।
সংগঠনের প্রেসিডিয়ামের ২৭ নেতার মধ্যে বেশিরভাগেরই বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ড. মীজানুর রহমান, শেখ শামসুল আবেদীন, চয়ন ইসলাম, ড. আহমদ আল কবির, আলতাফ হোসেন বাচ্চু, জাহাঙ্গীর কবির রানা, সিরাজুল ইসলাম মোল্লা, শাহজাহান ভূঁইয়া মাখন, প্রকৌশলী নিখিল গুহ ও সৈয়দ মাহামুদুল হক।
প্রেসিডিয়ামের অন্য সদস্যরাও এরই মধ্যে ৫০ বছর পেরিয়ে এসেছেন। তারা হচ্ছেন- আবুল বাশার, মোহাম্মদ আলী খোকন, আনোয়ারুল ইসলাম, অধ্যাপক এবিএম আমজাদ হোসেন, অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু ও ডা. মোখলেছুজ্জামান হিরু। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদের বয়স ৬০-এর ওপরে।
নাসরিন জাহান চৌধুরী শেফালী ছাড়া পাঁচ যুগ্ম সম্পাদকও ৫০ ছাড়িয়েছেন। নয় সাংগঠনিক সম্পাদকের মধ্যে সালাউদ্দিন মাহমুদ জাহিদ ও আমির হোসেন গাজীর বয়স ৬০-এর কোঠায়। অন্যদের বয়সও ৫০ পেরিয়েছে। ২৫ জন সহ-সম্পাদক এবং ৪১ জন কার্যনির্বাহী সদস্যের মধ্যে বেশিরভাগ নেতার বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় সদস্যদেরও বয়স গড়ে ৫৫ বছরের ওপরে।
অর্থাৎ বর্তমানে আওয়ামী যুবলীগের নেতৃত্বে যুবক নেই। বুড়োরাই আছেন। এই বুড়োদের নেতৃত্বেই চলছে যুবকদের সংগঠন যুবলীগ। অথচ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর তারুণ্যনির্ভর যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি। ওই সময়ে তার বয়স ছিল ৩২ বছর।
যুবলীগের প্রথম জাতীয় কংগ্রেসে অনুমোদিত গঠনতন্ত্রে সংগঠনের সদস্য হওয়ার বেলায় বয়সের বাধ্যবাধকতা ছিল। ওই সময়ে ৩৫ বছরের বেশি বয়সী যুবক এবং যুবার যুবলীগের সদস্য হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না বলে জানিয়েছেন সংগঠনের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ। এরপর দীর্ঘ সময় ওই বয়সসীমা অনুসরণ করা হয়নি। উল্টোটা হয়েছে।
২০১২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ষষ্ঠ কংগ্রেসে অনুমোদিত সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, যে কোনো যুবক ও যুবার যুবলীগের সদস্য হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বয়সসীমা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। এই সুযোগেই যে কোনো বয়সের ব্যক্তিরা যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়েই যুবকদের সংগঠন যুবলীগ মূলত বুড়োদের সংগঠনে রূপ নিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লেখক ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞান থাকলে যুব সংগঠনের নেতৃত্বে বুড়োরা থাকত না। আর যুব সংগঠনের দরকারও নেই। এটা মূল দলের কাজেও আসে না। মূল দলের অনেক নেতার বয়স ৪০ বছর। অথচ এর দ্বিগুণ বয়সীরা যুব সংগঠনে রয়েছে। তিনি যুব সংগঠনের সদস্যদের বয়স ৩৫ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ সমকালকে বলেছেন, সংগঠনের সদস্যদের বয়স-সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে সংগঠনের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা খুব একটা নেই বলে বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন।
এদিকে যুবলীগের কংগ্রেস নিয়ে দেশজুড়ে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে কোনো ধরনের আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা না গেলেও পদ-পদবি পেতে আগ্রহী নেতারা নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছেন। এই তৎপরতায় এবার ভিন্ন ধরনের কৌশল নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক পদে আগ্রহী নেতারা চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রেক্ষাপটে নিজেদের পরিচ্ছন্ন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
তবে এবারের কংগ্রেসের মাধ্যমে যুবলীগের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। চলমান দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের প্রতিফলনও ঘটবে কংগ্রেসে। অর্থাৎ দুর্নীতি ও নানা অপকর্মে জড়িত বিতর্কিত নেতারা নেতৃত্ব থেকে ছিটকে পড়বেন। কমপক্ষে চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন নেতা নির্বাচনের বেলায় সৎ, দক্ষ, ত্যাগী, পরীক্ষিত, উচ্চ শিক্ষিত ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে। তাদের বয়স হবে ৬০ বছরের কম।
বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের মধ্যে শেখ ফজলুল হক মনি, আমির হোসেন আমু এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিম যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্তমান চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীও বঙ্গবন্ধু পরিবারের আত্মীয়। তিনি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভগ্নিপতি। এ কারণে সব সময়ই যুবলীগ কংগ্রেসের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলে সংগঠনের চেয়ারম্যান পদে বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো না কোনো সদস্য কিংবা আত্মীয়ের নাম আলোচনার পুরোভাগে চলে আসে।
এবারও এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও শেখ ফজলুর রহমান মারুফের নাম চাউর হয়ে আছে। তারা সম্পর্কে চাচা-ভাতিজা। শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা-১০ আসনের এমপি ও শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে। শেখ ফজলুর রহমান মারুফ যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং শেখ ফজলুল হক মনির ভাই। শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপির ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নাইমের নামও আলোচনায় রয়েছে।
এই তিনজনের বাইরে যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য মির্জা আজমের নাম শোনা যাচ্ছে। যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মির্জা আজম জামালপুর-৩ আসনের এমপি। এ ছাড়াও যুবলীগ প্রেসিডিয়ামের দুই সদস্য অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান শহিদ (শহীদ সেরনিয়াবাত) ও মজিবুর রহমান চৌধুরী আলোচনায় রয়েছেন।
যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে আলোচিত এই নেতাদের মধ্যে বয়সের দিক থেকে সবার ছোট ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এবং ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নাইম। দু'জনেরই বয়স ৫০ বছরের কম। মির্জা আজমের বয়স ৫৭। শেখ ফজলুর রহমান মারুফ, অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান শহিদ (শহীদ সেরনিয়াবাত) এবং মজিবুর রহমান চৌধুরীর বয়স ৬০-এর বেশি।
সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্যদের তালিকায় রয়েছেন প্রেসিডিয়ামের পাঁচ সদস্য ফারুক হোসেন, মাহাবুবুর রহমান হিরন, আব্দুস সাত্তার মাসুদ, আতাউর রহমান, অ্যাডভোকেট বেলাল হোসাইন, দুই যুগ্ম সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, সুব্রত পাল ও ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিল। তাদের মধ্যে ফারুক হোসেন, মাহাবুবুর রহমান হিরন ও আব্দুস সাত্তার মাসুদ ষাটোর্ধ্ব। অন্যদের বয়স গড়ে ৫০ থেকে ৫৫ বছর।
যুবলীগের কয়েকজন সাবেক চেয়ারম্যান ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুবলীগের কংগ্রেস নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে খুব কম সময়ের মধ্যেই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের কথা বলার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটা হলে তারা যুবলীগের বর্তমান পরিস্থিতি এবং কংগ্রেস আয়োজনের কার্যক্রম নিয়ে কথা বলবেন।
কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, যুবলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের অপকর্মের কারণে এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছেন। তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে যুবলীগও অনেকাংশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। ব্যাংক হিসাব তলব করায় বিপাকে পড়েছেন সংগঠনের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগদান শেষে দেশে ফেরার পর গণভবনে সবার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেও যুবলীগ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেননি। ভারত সফরের আগে ও পরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নেতাদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময়েও একই ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সমকালকে জানিয়েছেন, জাতীয় কংগ্রেসের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুবলীগ। কোনো কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কংগ্রেস করতে না পারলে কমিটি ভেঙে দেওয়া হবে।
. . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . . .
প্রকাশক: ফয়সাল আহাম্মেদ খান, সম্পাদক : জীবন খান, উপদেষ্টা : ডি আই জি আনোয়ার (অব:), মোহাম্মদ আমিমুল এহসান খান, আইন উপদেষ্টা : ফেরদৌস কবির খান, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: মোঃ রাসেল কবির খান, বার্তা সম্পাদক: মোরশেদ আলম পাটোয়ারী, সিনিয়র সহ-সম্পাদক: সজীব হোসেন (জয়), সহকারি সম্পাদক: মোঃ জিল্লুর রহমান খান, সহকারি সম্পাদক: মোঃ ইমরান হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক : মতিউর রহমান (জনি), মফস্বল সম্পাদক: সঞ্জয় তালুকদার, এহতেশামুল হক (মাশুক), ক্রীড়া সম্পাদক : মোকাদ্দাস মোল্লা।
২৮/সি/৪ শাকের প্লাজা (টয়েনবি রোড) মতিঝিল, ঢাকা-১০০০। মোবাইল : ০১৭১৪-০২২৮৭৭, E-mail : jibonnews24@gmail.com
জীবন নিউজ ২৪ ডট কম লিমিটেড