
বরিশাল ব্যুরোঃ বরিশাল কোতোয়ালী মডেল থানার প্রভাবশালী এসআই মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে স্ত্রীর উপর অকথ্য নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। শারীরিক নির্যাতনে অতীষ্ট মহিউদ্দিনের স্ত্রী প্রমিলা আইনজীবীর মাধ্যমে তালাক দেন। তালাকের খবর পেয়ে মহিউদ্দিন আইনজীবী এবং কাজী ও কাজীর সহকারীকে ক্রসফায়ারের ভয়সহ বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি দেন। এমনকি কাজী ও তার সহকারীকে মারধর পর্যন্ত করা হয়। এ সময় যে বালাম খাতায় তালাক দেয়া হয়েছিল তা ছিড়ে নিয়ে আসে এসআই মহিউদ্দিন। অভিযোগ পাওয়া গেছে তালাক সম্পন্ন করতে প্রমিলা আইনজীবীকে ৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। ওই টাকার ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত মহিউদ্দিন তার বাসায় গিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে আসে। এসআই মহিউদ্দিন আইনজীবী এবং কাজী ও কাজীর সহকারিকে হুমকি দিয়েছেন এসব বিষয়ে কাউকে কিছু না বলার জন্য। এদিকে এ ঘটনার পর প্রমিলা তার আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেলে মহিউদ্দিন সেখান থেকে জোরপূর্বক তাকে নিয়ে আসে। প্রমিলাও এখন মহিউদ্দিনের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে পারিবারিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। মহিউদ্দিন তার পরিবার নিয়ে বর্তমানে নগরীর রূপাতলী
শেরে-ই বাংলা সড়কের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন। স্থানীয়রা ও প্রমিলার স্বজনরা জানান, ১১ বছর পূর্বে প্রেমের সম্পর্কে বিয়ে হয় মহিউদ্দিন ও প্রমিলার। বিয়ের আট বছর ভালোভাবেই কাটছিল তাদের দাম্পত্ত জীবন। এরপর থেকেই মহিউদ্দিনের আসল রূপ বের হতে থাকে। কারনে-অকারণে মহিউদ্দিন তার স্ত্রী প্রমিলার উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। ইতিমধ্যে তাদের সংসারে দু’টি সন্তান আসে। সর্বশেষ সন্তান হয় এ বছর জুন মাসে। দ্বিতীয় সন্তান প্রসব হওয়ার ৭ দিনের মাথায় মহিউদ্দিন প্রমিলার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনে অতীষ্ট হয়ে প্রমিলা তার এক বোনকে সাথে নিয়ে নগরীর সাগরদী এলাকার এক আইনজীবী বাসায় যান। সেখানে এসআই মহিউদ্দিনের নির্যাতনের সকল ঘটনা খুলে বলেন। আইনজীবী তালাক দেয়ার জন্য ৫ হাজার টাকা নেন। এরপর আইনজীবী ১৩নং ওয়ার্ডের কাজী আবুল ফারাহ মো. আলী আকবরকে খবর দেন। আলী আকবর তার সহকারি মোস্তাফিজকে পাঠান। মোস্তাফিজ তালাকের জন্য তাদের ব্যবহৃত সরকারি বালামে প্রমিলার দেয়া সকল তথ্য ও উপাত্ত তুলে ধরে তালাকের কাজ সম্পন্ন করেন। তালাক দেয়ার একদিন পর বিষয়টি জানতে পারে এসআই মহিউদ্দিন।
জানার সাথে সাথে প্রথমে প্রমিলাকে তার আত্মীয়ের বাড়ি থেকে জোরপূর্বক নিয়ে আসেন। এরপর কাজী অফিসে গিয়ে কাজী আলী আকবর ও সহকারি মোস্তাফিজকে হুমকি-ধামকি দিয়ে তাদের মারধর পর্যন্ত করা হয়। তার হুমকি-ধামকিতে কাজী তালাকের বালাম বই এসআই মহিউদ্দিনের নিকট বের করে দেন। এরপর মহিউদ্দিন ওই বালাম বই থেকে তালাক লেখা পৃষ্ঠা ছিড়ে নিয়ে যান। এ সময় দু’জনকে হুমকি দেয়া হয় বিষয়টি কাউকে জানালে ক্রসফায়ার দিয়ে দেবে। এছাড়া এ নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর হুমকিও দেন মহিউদ্দিন। এর দু’দিন পরে কাজী আল ফারাহ তৎকালীন কোতোয়ালী মডেল থানার ওসির কাছে জানান। ওসি বিষয়টি মিমাংশা করে দেন। মহিউদ্দিনের কাছে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানতে পেরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে নিজেকে বাঁচাতে তার পা ধরে মাফ চান। ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবে না বলে অঙ্গীকার করেন। কাজীর সহকারি মোস্তাফিজ জানান, প্রমিলা তালাক দিয়েছে জানতে পেরে মহিউদ্দিন আমাদের অফিসে এসে এলোপাথারি পিটিয়ে আহত করে ও তালাকের বই ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এছাড়া এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর হুমকি দেয়। সে হুংকার দিয়ে বলে, ‘আমি কোতোয়ালী মডেল থানার দারোগা মহিউদ্দিন। তুই জানিস না, প্রমিলা আমার বউ, কেন তালাকের কাজ করলি। ইয়াবা দিয়ে ধরিয়ে দেয়ার হুমকি দিলে আমি (মোস্তাফিজ) ভয়ে কোন পদক্ষেপ নিতে পারিনি। কাজী আবুল ফারাহ মোঃ আলী আকবর ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি মিমাংশা হয়ে গেছে। পুলিশের বিষয় বলে বাড়াবাড়ি করতে চাই না। তবে তাকে মারধরের কথা তিনি অস্বীকার করেন। এরপর মহিউদ্দিন আইনজীবী আনিসুল হক মীরের বাসায় গিয়ে হানা দেয়। প্রমিলার আইনী সহায়তাসহ কাজীর খরচ বাবদ আইনজীবীকে দেয়া ৪ হাজার টাকা জোরপূর্বক ফেরত নিয়ে যায় মহিউদ্দিন। আইনজীবী আনিসুল হক মীর জানান, প্রমিলা আমার কাছে তার স্বামীকে ডির্ভোস দিবে বলে আইনী সহায়তা চান। পরে আমি কাজীকে ডেকে তালাকের ব্যবস্থা করে দেই। এ কারনে মহিউদ্দিন আমাকে হুমকি দেয়। সেখানে আমার স্ত্রীর (আইনজীবীর স্ত্রীর) সাথে প্রমিলা কান্না কন্ঠে মহিউদ্দিনের অমানসিক নির্যাতনের বর্ননা তুলে ধরেন। প্রমিলা বলেন, মহিউদ্দিন প্রতিদিন মদ খেয়ে আমাকে মারধর করে। এমন কুলাঙ্গার সন্তান যেনো কোন মা জন্মগ্রহন না করায়। ওর উপর আল্লাহর গজব পড়বেই। পরে প্রমিলা মহিউদ্দিনকে তালাক দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং আমার (আইনজীবী) সহায়তা কামনা করেন। সূত্র জানায়, মহিউদ্দিনের মদ খেয়ে মাতলামি ও পরকীয়ার বিষয় নিয়ে স্ত্রী প্রমিলা বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ করে। এতে স্ত্রীর উপর মহিউদ্দিনের নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। মহিউদ্দিনের এমন বর্বরোচিত কর্মকান্ডে প্রমিলা মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। পরে মহিউদ্দিনকে তালাক দিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তালাক দেয়ার পরও প্রমিলাকে জোরপূর্বক তাদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা হয়। মহিউদ্দিন পুলিশের লোক হওয়ায় প্রমিলার পরিবার থেকে আইনে সহায়তা নিতে পারছে না। তাদেরকেও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে বলে একাধিক স্বজনরা বিষয়টি স্বীকার পেলেও তাদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।