
চলমান ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্যেই ব্যবসায়ী ও এক সময়ের চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের গুলশান-২ নম্বরের বাড়িতে ক্যাসিনো-জুয়া চলত। তার ঘনিষ্ঠজন এবং কিছু নির্দিষ্ট বিদেশি ক্যাসিনো খেলতেন সেখানে। বিদেশে বসে এই ক্যাসিনো আজিজ মোহাম্মদ ভাই নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। খেলায় ব্যবহার হতো আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নামের তিনটি শব্দের ইংরেজি আদ্যক্ষর দিয়ে লেখা (এএমবি) কয়েন। বসত মদ আর সিসার আড্ডা। বিদেশি মদ বাইরেও সরবরাহ করা হতো নিয়মিত। গুলশান-১ নম্বরে তার রয়েছে আরও একটি নিজস্ব ফ্ল্যাট, সেটি ব্যবহার হতো ‘রঙ্গশালা’ হিসেবে। আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়িতে মদ, সিসা, ক্যাসিনো সরঞ্জাম এবং তার নামের কয়েন জব্দ করা হলেও দুটি মামলার একটিতেও আসামি করা হয়নি তাকে। আসামি করা হয়েছে তার ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ ভাই এবং দুই কেয়ারটেকার নবীন মণ্ডল ও পারভেজকে। এদিকে গতকাল আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছে।
তিনজনকে আসামি করে গতকাল সোমবার গুলশান থানায় পৃথক দুটি মামলা করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। এরমধ্যে একটি মাদক মামলার আসামি ওমর মোহাম্মদ ভাই এবং অপর মাদক মামলায় আসামি করা হয়েছে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়ির কেয়ারটেকার নবীন ও পারভেজকে।
ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাই দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পালিয়ে আছেন। তিনি যেহেতু দেশে নেই তাই তাকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়নি। তবে তদন্তে তার সংশ্নিষ্টতা পাওয়া গেলে পরবর্তীকালে মামলায় তাকে সংযুক্ত করা হবে।
গুলশান ২ নম্বরের ৫৭ নম্বর সড়কে ১১/এ ও ১১/বি নম্বর হোল্ডিংয়ের পাশাপাশি দুটি ভবনে রোববার বিকেলে অভিযান চালায় ডিএনসি। একই সময় গুলশান ১ নম্বরে ২৮ নম্বর রোডে ৫২ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। এটি আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ফ্ল্যাট বলে জানা গেছে। এই ফ্ল্যাটে স্থায়ীভাবে কেউ থাকেন না। রঙ্গশালা হিসেবে ব্যবহার হতো সেটি। সেখানে তার ঘনিষ্ঠজনরা নিয়মিত মদের আড্ডা বসাতেন। সেখান থেকে ১০ বোতল বিদেশি মদ ও সিসা জব্দ করা হয়। গুলশান-২ নম্বরের ৫৭ নম্বর রোডের পাশাপাশি দুটি বাড়ি আজিজ মোহাম্মদ ভাইদের। দুটি বাড়ির প্রায় সব সদস্যই মাসের বেশিরভাগ সময় বিদেশে থাকেন। আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের স্ত্রী নওরীন আজিজ থাকেন ১১/এ নম্বর ভবনে। তবে দেশে আসা-যাওয়ার মধ্যেই থাকেন তিনি। সর্বশেষ কয়েকদিন আগে তিনি বিদেশে গেছেন। ওই ভবনে আরও থাকেন আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ ভাই ও ওমরের সহোদর আহাদ মোহাম্মদ ভাই। তারা আজিজের ভাই প্রয়াত রাজা মোহাম্মদ ভাইয়ের সন্তান। রোববার অভিযানের সময় ওমর মোহাম্মদ বাসাতেই ছিলেন। ডিএনসির কর্মকর্তারা প্রবেশের পরপরই বিকল্প পথ দিয়ে তিনি পালিয়ে যান। আহাদ কয়েকদিন আগে বিদেশে গেছেন। ওমর এবং আহাদ ১১/এ নম্বর পাঁচতলা ভবনের ছাদে মিনিবার গড়ে তুলেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সবকিছুই চলত আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নির্দেশনায়। বিদেশে বসে ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রকও ছিলেন তিনি। ১১/বি নম্বর ভবনের চারতলার ফ্ল্যাটে গড়ে তোলা হয়েছিল মদের গোডাউন। ডিএনসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নির্দেশে তার দুই কেয়ারটেকার নবীন মণ্ডল ও পারভেজ গুলশান এলাকায় মদ সরবরাহ করতেন। ব্যাগে করে তারা গ্রাহকের কাছে মদ পৌঁছে দিতেন। অভিযানের সময় নবীন ও পারভেজকে আটক করা হয়। গতকাল দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে পাঠানো হয়।
ডিএনসির জিজ্ঞাসাবাদে নবীন জানিয়েছেন, সপ্তাহে অন্তত দু’দিন আজিজ মোহাম্মদ ভাই তাকে বিদেশ থেকে ফোন করতেন। তবে ফোনে কী কথা হতো তা বিস্তারিত জানাননি তিনি। ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, মদ কোথায় কার কাছে পৌঁছাতে হবে আজিজ ভাই ফোনে নবীনকে নির্দেশনা দিতেন।
অভিযানে মিনিবার ও গোডাউন থেকে ৩৭২ বোতল বিদেশি মদ, সিসা, সিসার উপকরণ, গাঁজা ও ক্যাসিনো সামগ্রী জব্দ করা হয়। ক্যাসিনো সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে একটি ক্যাসিনো বোর্ড, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের নামের তিনটি শব্দের ইংরেজি আদ্যক্ষর দিয়ে লেখা সোনালি রঙের (এএমবি) এক হাজার ছয়শ’ কয়েন। এ ছাড়া তাস ও ঘুঁটিও জব্দ করা হয় সেখান থেকে। এসব উদ্ধারের ঘটনায় ডিএনসির পক্ষ থেকে গুলশান থানায় দুটি মাদক মামলা করা হয়েছে। এরমধ্যে ডিএনসির উপপরিদর্শক আতাউর রহমান বাদী হয়ে দায়ের করা মামলার আসামি আজিজ মোহাম্মদের ভাতিজা ওমর মোহাম্মদ ভাই। ওমর মোহাম্মদ পলাতক আছেন। অপর মামলার বাদী ডিএনসির পরিদর্শক এসএম সামসুল কবীর। এই মামলায় আসামি করা হয়েছে কেয়ারটেকার নবীন ও পারভেজকে। ওমর মোহাম্মদ পলাতক আছেন। দুটি মামলার একটিতেও আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে আসামি করা হয়নি।
অভিযানে অংশ নেওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা রোববার অভিযানের সময় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়ি থেকে মদ, সিসা, গাঁজা ও ক্যাসিনো জব্দের কথা বলেছিলেন। অথচ এজাহারে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাড়ি বা ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বাসার মালিকের নাম সরাসরি না লিখে একাংশে বলা হয়েছে-ওই বাসার মালিক বা তার পরিবারের সদস্য কিংবা অন্য কেউ ঘটনার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়। বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ডিএনসির পরিদর্শক ও একটি মামলার বাদী এসএম সামসুল কবীর সমকালকে বলেন, ৮-১০ বছর ধরে আজিজ মোহাম্মদ ভাই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এ কারণে তাকে আসামি করা হয়নি। তবে যে ফ্ল্যাট থেকে মদ, সিসা ও ক্যাসিনো সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে তদন্তসাপেক্ষে সেই ফ্ল্যাটের মালিক বা অন্য কেউ এর সঙ্গে জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ: বিতর্কিত ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাসায় অভিযানের পর দিন তার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার স্বার্থসংশ্নিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে কোনো অ্যাকাউন্ট থাকলে আগামী ৩০ দিনের জন্য তা ফ্রিজ রাখতে বলা হয়েছে। গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) থেকে সব ব্যাংকের এমডি বরাবর চিঠি দিয়ে তার স্বার্থসংশ্নিষ্ট সব হিসাব ফ্রিজের আদেশ দেওয়া হয়।
সোমবার তার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ছাড়াও লেনদেনের যাবতীয় তথ্য, অ্যাকাউন্ট খোলার ফরমসহ সব ধরনের তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে।
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহ ও সোহেল চৌধুরী হত্যার ঘটনায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সপরিবারে থাইল্যান্ডে থাকেন তিনি। গুলশানের বাসায় তার আত্মীয়স্বজনরা থাকেন। অভিযানের সময় দু’জন কেয়ারটেকারকে আটক করা হয়। তার স্ত্রীর নাম নওরিন মোহাম্মদ ভাই। বাবার নাম মোহাম্মদ ভাই, মায়ের নাম মনোয়ারা বেগম (খাদিজা মোহাম্মদ ভাই)।