কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের অববাহিকার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল চর কাজাইকাটা গ্রাম। বাড়িতে হস্তচালিত তাঁতে একমনে রঙিন চাদর বুনছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জামাল উদ্দিন। কাছে এগিয়ে গিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করতেই বিষাদমাখা মুখখানি তুলে বসতে বললেন। বললেন, ভালো নেই। ১৫ বছর আগে ২০টি তাঁতে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, চাদর বানিয়ে কূল পেতেন না। আর এখন তাঁতের সংখ্যা তিনটিতে এসে ঠেকেছে। ঋণে জর্জরিত। শুধু শীতের চাদর বানান। স্ত্রী সহযোগিতা করেন। দুজন শ্রমিকও রেখেছেন। কিন্তু এভাবে আর সংসার চলছে না!
জামাল উদ্দিনের মতো একই দশা চরাঞ্চলের তাঁতিদের। দেড়শ বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এখন ধুঁকছে। বংশপরম্পরার তাঁতিরা জানান, তাদের বাপ-দাদারা যখন এসব চরে আসেন তখন কোনো ফসল হতো না। আর তাদের অনেকেই ছিলেন নদীভাঙন এলাকার তাঁতি। এ তাঁতিরাই এখানে তাদের পেশা প্রতিষ্ঠিত করেন। অন্য উপায় না থাকায় দ্রুতই প্রসার ঘটে তাঁত শিল্পের। একসময় রৌমারী উপজেলার বিভিন্ন চর মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার তাঁত গড়ে ওঠে। রংপুর অঞ্চলের মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদের সিংহভাগই জোগান দিতেন এ তাঁতিরা। এছাড়া বৃহৎ পাইকারি বাজার টাঙ্গাইল, বাবুবাজার হয়ে চলে যেত দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ সোনালি সময় টিকে ছিল ২০০০ সালের আগে পর্যন্ত।
এরপর জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধি, সুতার দাম বেড়ে যাওয়ার বিপরীতে তাঁতপণ্যের দাম কমে যাওয়া, আধুনিক পোশাক শিল্পের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারা, সর্বোপরি বাজার সম্প্রসারণে ব্যর্থতার কারণে বর্তমানে মাত্র হাজার দুয়েক তাঁত সচল রয়েছে। সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় ঋণের জালে জড়িয়ে গেছেন অধিকাংশ তাঁতি।
চর কাজাইকাটা গ্রামের রজামাল উদ্দিন বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে সুতা কিনে চাদর তৈরি করছেন। সপ্তাহে ১ হাজার ৩০০ টাকা কিস্তি। বাজারের যে অবস্থা, কিস্তির টাকা জোগাড় করাই কঠিন হয়ে গেছে। এনজিওর ঋণ নিয়ে পোষাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তাঁত বন্ধ করে দিয়েছেন পার্শ্ববর্তী চরশৌলমারী গ্রামের মোসলেম উদ্দিন।
তাঁতিরা বলেন, কিস্তির চাপে এক জোড়া চাদর মাত্র ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তাতে উৎপাদন খরচই উঠছে না। অথচ চাদর মজুদ করে ভরা শীত মৌসুমে বেচতে পারলে ৫০০ টাকা জোড়া পাওয়া যেত।
সম্প্রতি রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী ও বন্দবেড় ইউনিয়নের চরকাজাইকাটা, ফুলকারচর, খেওয়ারচর, গেন্দার আলগা, সোনাপুর, চর শৌলমারী, বাঘমারা ও পালেরচর ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। অল্প কিছু সচল রয়েছে, তবে তাঁতিরা ভালো নেই। সেগুলোও অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে।
চর শৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান কেএম ফজলুল হক মণ্ডল বলেন, তার ইউনিয়নের চর কাজাইকাটা, ফুলকারচর, খেওয়ারচর, গেন্দার আলগা, সোনাপুর, চর শৌলমারী ও বন্দবেড় ইউনিয়নে বাঘমারা, পালেরচরে প্রায় ২০ হাজার তাঁত ছিল। এখন সব গ্রাম মিলে সচল তাঁত দুই হাজারের বেশি হবে না।
তাঁতিদের দুরবস্থা নিয়ে কথা বললে কুড়িগ্রাম বিসিক শিল্প নগরীর উপব্যবস্থাপক (ডিএম) রহিদুল ইসলাম খান জানান, তিনি এক বছর ধরে এখানে দায়িত্বে আছেন কিন্তু রৌমারীর কোনো তাঁতি কখনো তার কাছে আসেননি। তাছাড়া বিসিক থেকে তাঁত শিল্পে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা নেই। এটা রংপুর থেকে করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে রংপুর বিসিক কার্যালয়ের প্রমোশন অফিসার এহসানুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, আমরা কুড়িগ্রাম বিসিকের পরামর্শে কুড়িগ্রাম ও উলিপুর উপজেলায় ১৯৫ জন নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ ও অর্থিক সহযোগিতা করেছি। তারা শতরঞ্জি তৈরি করছেন। তিনি এ প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। আর কুড়িগ্রাম বিসিক চাইলে রৌমারীর তাঁতিদেরও প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা করা যাবে।
খোঁজখবর নিয়ে তাঁতিদের চাহিদামতো সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোছাম্মদ সুলতানা পারভীন।







