
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তেহরান ও আশপাশের এলাকায় তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। একই সময়ে কয়েকজন মার্কিন সেনাকে আটক করার দাবি করেছে ইরান। তবে এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
শনিবার রাতে তেহরান ও পার্শ্ববর্তী শহর কারাজসহ একাধিক তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। হামলার পর বিভিন্ন এলাকায় আগুন ধরে যায় এবং আকাশ ঢেকে যায় ঘন কালো ধোঁয়ায়। শক্তিশালী বিস্ফোরণে আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।
ইরানের তেল মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তেহরান ও আলবোর্জ প্রদেশের কয়েকটি তেলের ডিপো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীও হামলার বিষয়টি স্বীকার করে দাবি করেছে, এসব জ্বালানি মজুত কেন্দ্র ইরানি সেনাবাহিনীর কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তাই সামরিক অবকাঠামো দুর্বল করতেই এই হামলা চালানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ তেহরানের শাহর রেই এলাকায় একটি তেল ডিপোতে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ডিপোর কাছেই রয়েছে শহরের প্রধান তেল শোধনাগার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিশাল আগুনের শিখা আকাশে উঠতে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলার প্রভাবে আশপাশের বসতবাড়ি, দোকানপাট, সড়ক, পানির পাইপলাইন এমনকি কিছু হাসপাতাল ও স্কুলও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেহরান ঘনবসতিপূর্ণ শহর হওয়ায় সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে শনিবার ভোরে তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরেও হামলার খবর পাওয়া যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিমানবন্দর ও তেল ডিপো এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ কয়েক মাইল দূর থেকেও শোনা গেছে।
এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলি লারিজানি দাবি করেছেন, যুদ্ধ শুরুর পর কয়েকজন মার্কিন সেনাকে আটক করেছে ইরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “আমার কাছে খবর এসেছে যে কয়েকজন আমেরিকান সেনাকে বন্দি করা হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছে।”
তবে এই দাবি নাকচ করেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে বলেন, “ভিত্তিহীন গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোই এখন ইরানি প্রশাসনের প্রধান কৌশল।” আল জাজিরা জানিয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও ইরানের অভিযোগকে ভিত্তিহীন অপপ্রচার হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
একই সময়ে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নাইনি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্তত ছয় মাস তীব্র যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা রয়েছে তাদের। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ইরান প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এই সংঘাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “সামরিক শক্তি দিয়ে বর্তমান সংকটের সমাধান হবে না।” বিবিসি জানিয়েছে, তিনি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংক লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশসীমা লঙ্ঘনকারী একাধিক শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন প্রতিহত করছে দেশটির সেনাবাহিনী। তবে হামলার জন্য কারা দায়ী তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি।
এই সংঘাতের আরেকটি ঘটনায় লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইরানি বাহিনীর ওপর সুনির্দিষ্ট হামলা চালানোর দাবি করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। আইডিএফ বলছে, ইরানের কুদস ফোর্সের লেবানন কর্পসের কমান্ডারদের লক্ষ্য করেই ওই হামলা চালানো হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ১৮০ জন শিশুসহ ১ হাজার ৩৩২ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই যুদ্ধে অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।