গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হয়। ফাইল ছবিক্যাসিনো–কাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ‘রাঘববোয়ালদের’ বিপুল অবৈধ সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসছে। দেশে মানিলন্ডারিংসহ বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্যও আসছে। এসব ‘রাঘববোয়াল’ যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন, তাঁদের বিদেশযাত্রায় তাই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এরই মধ্যে তিন সাংসদসহ ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার (ইমিগ্রেশন) বরাবর চিঠি দিয়ে এঁদের বিদেশযাত্রা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।
সরকারের অন্য সংস্থাগুলোও এ বিষয়ে কাজ করছে। যুবলীগের সদ্য অব্যাহতি পাওয়া চেয়ারম্যান ওমর ফারুক, যুবলীগের প্রভাবশালী কয়েক নেতাসহ বেশ কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব তলব ও জব্দের আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এঁদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বাবু, তাঁর স্ত্রী সায়মা আফরোজ, তাঁদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান সূচনা ডায়িং অ্যান্ড প্রিন্টিং লিমিটেড, স্টার ট্রেডিং কোম্পানি, বাবু এন্টারপ্রাইজ ও সূচনা ডায়িং প্রিন্টিং উইভিং ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাব তলব করেছে এনবিআর। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার, স্ত্রী পারভীন লুনা, মেয়ে নুজহাত নাদিয়া নীলা এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠান ফাইন পাওয়ার সল্যুয়েশন লিমিটেড; যুবলীগের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, তাঁর স্ত্রী শেখ সুলতানা রেখা, ছেলে আবিদ চৌধুরী, মুক্তাদির আহমেদ চৌধুরী ও ইশতিয়াক আহমেদ চৌধুরী এবং তাঁদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লেক ভিউ প্রোপার্টিজ ও রাও কনস্ট্রাকশন; যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুর রহমান মারুফ, তাঁর স্ত্রী সানজিদা রহমান, তাঁদের দুটি প্রতিষ্ঠান টি-টোয়েন্টিফোর গেমিং কোম্পানি লিমিটেড ও টি-টোয়েন্টিফোর ল’ ফার্ম লিমিটেডের ব্যাংক হিসাব; স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থবিষয়ক সম্পাদক কে এম মাসুদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী লুতফুর নাহার লুনা, বাবা আবুল খায়ের খান, মা রাজিয়া খান এবং তাঁদের প্রতিষ্ঠান সেবা গ্রীন লাইন লিমিটেড; ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সহসভাপতি মুরসালিক আহমেদ, তাঁর বাবা আবদুল লতিফ, মা আছিয়া বেগম এবং স্ত্রী কাওসারী আজাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে এনবিআর।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে প্রথম দিনই রাজধানীর ইয়াংমেনস ফকিরাপুল ক্লাবে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কার করা হয়) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন অভিযানে একে একে গ্রেপ্তার হন কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার এস এম গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, মোহামেডান ক্লাবের ডাইরেক্টর ইনচার্জ মো. লোকমান হোসেন ভূইয়া, ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট, সম্রাটের সহযোগী এনামুল হক আরমান, কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল আলম (ফিরোজ), অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমানের (মিজান) ও তারেকুজ্জামান রাজীব।
ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তিন সাংসদসহ ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। বেশ কয়েকজনের ব্যাংক হিসাব তলব ও জব্দের আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।গ্রেপ্তার হওয়া এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে বিপুল অর্থের মালিক হওয়া, অর্থ পাচারসহ নানা অভিযোগ ওঠে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের অপকর্মে সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সাংসদ, রাজনীতিক, সরকারী কর্মকর্তাসহ বিভিন্নজনের নাম উঠে আসে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর তদন্তের পাশাপাশি এঁদের অবৈধ সম্পদের খোঁজে মাঠে নামে দুদক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনো–কাণ্ডে জড়িতদের সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধান দল গঠন করে। পরে আরও দুজনকে দলে যুক্ত করা হয়। অনুসন্ধান দলের সদস্যরা গণমাধ্যমে আসা বিভিন্ন ব্যক্তির নাম যাচাই–বাছাই করে একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করে। সংস্থার গোয়েন্দা শাখার পক্ষ থেকে এসব তথ্য যাচাই–বাছাই করা হয়। পাশাপাশি র্যাব ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধানেরা দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক করে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেন। সেসব তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করে ইতিমধ্যে চারটি মামলা করে দুদক দল। জি কে শামীম, খালিদ মাহমুদ ভূঁইয়া, গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক এনু ও তাঁর ভাই গেন্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক রুপন ভূইয়ার বিরুদ্ধে চারটি আলাদা মামলা হয়।
শুরুতে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের কথা জানালেও এখন পর্যন্ত দুদকের অনুসন্ধান তালিকায় প্রায় ১০০ জনের নাম এসেছে। দুদক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিদিনই তালিকায় নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। সূত্রটি বলছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ অর্জনের অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠছে, তাঁদের প্রত্যেককেই অনুসন্ধানের আওতায় আনবে দুদক। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে উঠবে না। তাঁদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হবে।







