
ক্যাসিনোকান্ডে গ্রেফতার ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার বসরা নিয়মিত যান সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে ক্যাসিনোতে। বিশ্বের নামিদামি জুয়াড়িদের সাথে তাদের সেখানে দেখা হয়। মেরিনা বে ক্যাসিনোতে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা লাখ লাখ ডলার উড়ছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের দুই জন কর্মকর্তা নিয়মিত যান মেরিনা বে ক্যাসিনোতে। তারা সেখানকার বড় জুয়াড়ি। খেলাধুলার উন্নয়নে তাদের কোনো খবর নেই। সব সময় পড়ে থাকেন জুয়া খেলায়। এছাড়া ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকার ঋণ নিয়ে ঋণখেলাপি হওয়া ব্যক্তিরাও যান সেখানে। বন্ড জালিয়াতি সিন্ডিকেটের হোতারাও যান মেরিনা বে ক্যাসিনোতে। বন্ড জালিয়াতি চক্রের একজন সিঙ্গাপুরে বাঙালি কমিউনিটিতে ‘খান ভাই’ হিসেবে পরিচিত। সিঙ্গাপুরে কাজ করা বাংলাদেশি শ্রমিকরাও যান সেখানে। তাদের জন্য রয়েছে নিচ তলায় ক্যাসিনো খেলার ব্যবস্থা। শ্রমিকরা সর্বোচ্চ দুই হাজার ডলারের ক্যাসিনো খেলেন। এতে বেশিরভাগ শ্রমিক নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকে লাভবানও হয়েছে।
ইত্তেফাকের এই প্রতিবেদক মেরিনা বে ক্যাসিনোতে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। দেখা যায়, নিচ তলায় আছে শতাধিক ক্যাসিনো খেলার বোর্ড। সেখানে ক্যাসিনো খেলছেন এমন ৪/৫ জন বাংলাদেশির সঙ্গে কথাও হয়েছে। তারা হলেন: ফরিদপুরের ইব্রাহিম, ঝিনাইদহের সোহেল, মুন্সিগঞ্জের মহসিন ও চাঁদপুরের শহীদ। কারা এখানে আসেন, কিভাবে টাকা উড়ান বিস্তারিত সব কিছু তারা জানান। ইব্রাহিম এক দিনে ১০ হাজার ডলার জিতেন। সাথে সাথে ৯ হাজার ডলার দেশে পাঠিয়ে দেন। এক মাসে ক্যাসিনো খেলে সমান সমান হয়েছে তার। আরেকজন ক্যাসিনো খেলে এক বছরে ৪০ লাখ ডলার জেতেন। তবে অনেকে শূন্য হাতে ফেরেন। বাংলাদেশে চলমান শুদ্ধি অভিযানের মধ্যে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যাওয়া ১০ জনের সঙ্গেও কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। তারাও মেরিনা বে ক্যাসিনোতে নিয়মিত যাচ্ছেন। তবে তারা নাম প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
মেরিনা বে ক্যাসিনোর দ্বিতীয় তলায় বড় জুয়ারিরা খেলেন। সম্রাটের বসরাও এখানে খেলেন। যারা জিরো থেকে ইসলাইল চৌধুরী সম্রাটকে ‘সম্রাট’ বানিয়েছেন তারাও এখানে যান নিয়মিত। বাংলাদেশের লাখ লাখ ডলার উড়ে এখানে। মেরিনা বে ক্যাসিনোটি অত্যাধুনিক, সুরক্ষিত ও সুসজ্জিত। কঠোর নিরাপত্তা সম্বলিত এই ক্যাসিনো পরিচালনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে সিঙ্গাপুরের কোনো নাগরিক ক্যাসিনো খেলতে পারেন না। বিদেশিদের জন্য এটা সংরক্ষিত। ক্যাসিনো বোর্ডের প্রতি টেবিলে রোবট ঘুরে ঘুরে জুয়ারিদের চা, কফি ও জুস পরিবেশন করে।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, জুয়াড়িরা গল্প-আড্ডায় তাদের স্মৃতি আওড়াচ্ছেন। কত কথা, কত কাহিনীর জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশি গ্যাম্বলাররা। ঢাকার সম্রাট সিঙ্গাপুরেও ছিলেন নাম্বার ওয়ান। যে ক’জন জুয়াড়ি জিতে কিংবা হেরে পাইজা চেয়ারম্যান কার্ড অর্জন করেছেন সম্রাট তার অন্যতম। তার সর্বশেষ খেলা ছিল এমবিএস-এর পাইজা রুমে। যার অবস্থান ক্যাসিনোর তৃতীয় তলার এক্সক্লুসিভ জোনে। ওই এলাকায় সাধারণ জুয়াড়িদের পা ফেলা বারণ। তবে একজন পাইজা মেম্বার নারী বা পুরুষ দু’জন সহযোগীকে স্পন্সর করতে পারেন। ওই অঙ্গনে চীনা বংশোদ্ভূত এক পাইজা প্লাটিনাম মেম্বারের সহযোগী হিসেবে যাতায়াতকারী সিঙ্গাপুরে কর্মরত বাংলাদেশের যশোর অঞ্চলের এক বাসিন্দা বলেন, যেকোনো ক্যাসিনোর জন্য পাইজা মেম্বার হীরার টুকরার মতো, মূল্যবান। মিলিয়ন ডলার খেলে ধাপে ধাপে এটি অর্জন করতে হয়। পাইজা মেম্বারদের আবার অনেকগুলো স্তর আছে। পয়েন্ট রেট সুযোগ-সুবিধায় ফারাক অনেক। এটি অর্জনে একেক দেশে একেক নিয়ম। দুনিয়াসেরা লাসভেগাস বা মিশিগানের এমজিএম ক্যাসিনো কিংবা চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ম্যাকাও সর্বত্রই সমাদৃত পাইজা মেম্বাররা। তবে তাদের সুবিধাদি ভিন্ন। দেশভেদে তারতম্য হয়। ক্যাসিনো-জুয়াড়ি ইসমাঈল হোসেন সম্রাট সত্যিই এক বিস্ময়।
তিনিই একমাত্র বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যিনি পাইজা প্রিমিয়াম, পাইজা প্লাটিনাম এই দুই ধাপ রয়েছেন। এরপর অর্জন করেছেন পাইজা চেয়ারম্যানের খেতাব। সিঙ্গাপুরে পৌঁছেই টের পাওয়া যায়, সম্রাট ও তাদের বসদের চেনেন না এমন প্রবাসী বাংলাদেশি কম। জুয়া যেহেতু বৈধ, তাই এ নিয়ে জুয়াড়িদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে বেগ পেতে হলো না। সম্রাটের বসদের নাইট লাইফের নানান চাঞ্চল্যকর কাহিনী সিঙ্গাপুরের বসবাসরত বাংলাদেশি জুয়াড়িদের মুখে মুখে। জুয়াড়িদের সিঙ্গাপুরে আলাদা সম্মানও রয়েছে।