
মাত্র তিন বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ছিল। বিশ্বের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দেশটি প্রভাব বিস্তার করতে পারত। তবে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প সবকিছু থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। প্রেসিডেন্টের দপ্তরে বসেই ট্রাম্প একের পর এক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতা বাতিল করেছেন। ১২টি দেশের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি ‘ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ’ থেকে বের হয়ে গেলেন। ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করলেন। নিজের দেশকে প্রত্যাহার করে নিলেন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে। রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক মিসাইল–সংক্রান্ত চুক্তি ‘ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জনিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) ট্রিটি’ থেকেও বেরিয়ে গেছেন ট্রাম্প। এ ছাড়া একের পর এক বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা এবং মিত্রদেরকে নানান হুমকি দিচ্ছেন।
আফ্রিকার ৪০ জন নেতা অর্থ ও অস্ত্রের সন্ধানে চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর রাশিয়ায় এক বিশেষ বৈঠকে মিলিত হয়। পররাষ্ট্র অথবা অভ্যন্তরীণ—যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্প প্রথা মানেন না। তিনি বিশেষজ্ঞ মতামতের ধারেকাছেও ভেড়েন না। জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সিদ্ধান্ত নিতে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এনএসসি) সভায় যান না। পরিবর্তে নিজের জ্ঞানের ওপর ভর করে সিদ্ধান্ত নিতে স্বস্তি পান। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন কর্মপন্থা নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে এরই মধ্যে দুর্বল করে ফেলেছেন ট্রাম্প। যেসব দক্ষ লোক নিরাপত্তাবিষয়ক বিভিন্ন কর্মপন্থা নির্ধারণ ও পরিচালনা করতেন, তাঁদের তিনি দূরে সরিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিশ্বাসযোগ্যতা ও দক্ষতায় ক্ষত তৈরি করেছেন ট্রাম্প। বিশ্বব্যাপী মার্কিন কূটনীতির মতো শক্ত কাজ তিনি যেন একাই সেরে ফেলতে চান। পররাষ্ট্র দপ্তর চালানোর এই রীতিতে আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, চীন ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা সফল হয়েছেন। তবে আঘাতটা লেগেছে ভেতরে। এই রীতির কারণে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ট্রাম্পের এমন ধারায় দেশ চালানোয় মার্কিন জাতীয় স্বার্থে বিপর্যয় নেমে এসেছে, আর এটা আশীর্বাদ হয়েছে পুতিনের জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদিও পুতিনকে সে দেশে স্বাগত জানিয়েছে। কূটনৈতিক বিষয়ে পুতিন নমনীয় মনোভাব দেখান। তিনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর কোনো দেশেরই চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। যেটা আছে তা হলো চিরস্থায়ী স্বার্থ। এ কারণে ২০১৫ সালে যে তুরস্ক রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছিল, কিছুদিন না যেতেই তাকে আপন করে নিলেন পুতিন। সম্প্রতি তুরস্ক রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনেছে। এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ন্যাটোর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ এঁকে দিয়েছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরবের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পদক্ষেপ নিয়েছেন। সংযুক্ত আবর আমিরাত সফর করেছেন, মিসরের দিকেও এগোচ্ছেন। এসবের পাশাপাশি পুতিন নজর দিয়েছেন মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে।
পূর্বতন কলোনি মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র থেকে ফ্রান্স ২০১৭ সালে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। এতে দেশটিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে শূন্যতা তৈরি হয়। পুতিন এই সুযোগ লুফে নেন। ফ্রান্সের চলে যাওয়ার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই পুতিনের পক্ষ থেকে রাশিয়ার ব্যবসায়ীরা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে হাজির হন। এর কিছুদিন পরে রাশিয়ার সেনারা সেখানে নামেন।
পুতিনের এমন ধারায় এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, সামনের দিকে যেতে তিনি কিছু নীতি মেনে চলেন। তিনি মিত্রদের সমর্থন করেন, রাশিয়ার সবল দিকগুলো নানাভাবে কাজে লাগান, সংকটের সময় একেবারে ধীরস্থির থাকেন এবং প্রতিপক্ষকে সুযোগ করে দিতে পারে—এমন জায়গা কখনো ছাড়েন না।
নিজ ঘরেই সমালোচিত পুতিন। মাঝেমধ্যে দুর্নীতিবিরোধী কিংবা গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভ জানান রাশিয়ার জনগণ। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে রাশিয়া এখনো অনেক পিছিয়ে। দ্য ইকোনমিকস বলছে, অর্থনৈতিক চুক্তির জায়গাতে রাশিয়ার বাগাড়ম্বর ও বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তার ফারাক। ২০১৮ সালে রাশিয়া সাব-সাহারা অঞ্চলের দেশগুলোতে ৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য করেছে। একই সময়ে ওই এলাকাতে আমেরিকার বাণিজ্য ছিল ১২০ বিলিয়ন ডলার। সামরিক ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলে রাশিয়া কিছুটা অনুজ্জ্বল। পুতিনের দাবি, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে তিনি অন্তত ৩০টি যৌথ সামরিক চুক্তি করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত ওই সব দেশে কিছু গৌণ সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়া বড় কোনো মহড়া দেখাতে পারেননি পুতিন।
নিজ ঘরেও পুতিন নানা সমস্যার উল্লেখযোগ্য সমাধান করতে পারেননি। রাশিয়ার জমা করে রাখার মতো অর্থের পরিমাণ টানা ছয় বছর ধরে নিম্নমুখী। ক্রমাগত দুর্নীতির ঘুরপাকে পড়ে রাশিয়ার জনগণ ক্ষুব্ধ। তাই সোভিয়েত ধাঁচে বিশ্বব্যাপী রাশিয়ার প্রভাব তৈরি করতে চাইলে পুতিনকে ঘরে ও বাইরে—দুটোই সামাল দিয়ে হাঁটতে হবে আরও বহু পথ।