ঢাকা , রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় জলদস্যু আতঙ্কে জেলেরা

প্রতিনিধির নাম :

 

লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকারে পুরোদমে নেমেও জলদস্যু আতঙ্কে রয়েছেন জেলেরা। নদীতে নৌ পুলিশের তৎপরতা না থাকায় কয়েক দিন ধরে নৌকায় গণহারে ডাকাতি হচ্ছে। রামগতির চরআবদুল্লাহ মেঘনা নদী থেকে অপহরণের দু’দিন পর জেলে সাইফুল হাওলাদারের মৃতদেহ পুলিশ উদ্ধার করলেও নিখোঁজ রয়েছেন আবুল কালাম নামের আরেক জেলে। চাঁদার দাবিতে অপহরণের ঘটনায় জলদস্যু-আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন জেলেসহ নৌরুটে চলাচলকারী যাত্রীরাও। তবে পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন বলেছেন, জেলেরা যেন নিরাপদে মাছ শিকার করতে পারেন, সে জন্য নদীতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন জলদুস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। অন্যদিকে জেলেদের অভিযোগ, দস্যুদের অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া ও নদীতে জলদস্যু গ্রেফতার তৎপরতা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহে অত্যাচার সহ্য করে ও চাঁদা দিয়ে মাছ ধরছেন জেলেরা। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় প্রায় ৪৬ হাজার জেলে রয়েছেন। তাদের মধ্যে নিবন্ধিত ২৭ হাজার ৮০০ জেলে। এদের অধিকাংশই মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল এলাকার ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে থাকেন এখানকার জেলেরা। তবে জেলার রামগতির চরগজারিয়া, বয়ারচর, চরআবদুল্লাহ, তেলিরচর এবং তার আশপাশের জেলেরা নদীতে যাচ্ছেন না জলদস্যু ও ডাকাত-আতঙ্কে। কিছু জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গেলে মারধর করে মাছ, জাল ও নৌকা নিয়ে যায়। বাধা দিলে ধরে নিয়ে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালায় মুক্তিপণের জন্য। অনেক সময় এদের হাতে প্রাণও দিতে হচ্ছে নদীতে আসা জেলেদের। জানা গেছে, ২১ জুন রামগতির মেঘনার চরআবদুল্লাহ থেকে সাত জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় জলদুস্যরা। মুক্তিপণ আদায়ের পর মাঝনদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পাঁচজন সাঁতার কেটে কূলে আসেন। দু’জন নিখোঁজ হন। এর দু’দিন পর সাইফুল হাওলাদার নামের একজনের লাশ উদ্ধার করা হলেও আবুল কালামের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। এভাবে প্রায়ই জলদস্যুদের হাতে হামলার শিকার হতে হয় জেলেদের।

রামগতির জেলে নেতা সামছুদ্দিন ও উদ্ধারকৃত জেলেদের স্বজনরা জানান, সাইফুল হাওলাদারসহ অন্য জেলেরা প্রতিদিনের মতো নদীতে মাছ শিকারে যান। গত ২১ জুন গভীর রাতে জলদস্যু কালা জাকের, জমির, বাদশা ও মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে জলদস্যুরা রামগতির চরআবদুল্লাহ মেঘনা নদী এলাকা থেকে সাত জেলেকে অপহরণ করে। এরপর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে তারা। মুক্তিপণের কিছু টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এরপর মেঘনা নদীতে ওই সাত জেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সাঁতার কেটে জেলে ফারুক, রাসেল, বেলাল হোসেন, আমির হোসেন, কবির হোসেনসহ পাঁচজন কূলে এলেও সাইফুল হাওলাদার ও আবুল কালাম মাল নামের দুই জেলে নিখোঁজ হন। সকালে মেঘনার রামগতি এলাকায় সাইফুল হাওলাদারের লাশ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তার লাশ উদ্ধার করে। অপর জেলে আবুল কালাম এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় মৎস্য আড়তদাররা অভিযোগ করে জানান, জেলেদের কাছ থেকে টোকেনের মাধ্যমে জলদস্যু ডাকাতরা চাঁদাবাজি করছে। প্রতি বর্ষায় নৌকাপ্রতি চাঁদা দিতে হচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। আর ঘাটে এক হালি মাছ বিক্রি করতে দিতে হয় তাদের ৫০ টাকা। এর বাইরেও আরও অনেক স্থানে চাঁদা দিতে হয় তাদের। জলদস্যুদের দাবি করা চাঁদা না দিলে নদীতে মাছ ধরতে গেলে হামলা, লুটপাট, অপহরণ, নির্যাতন ও পরে মুক্তিপণ দিয়ে তাদের কাছ থেকে মুক্তি মেলে। পুরোদমে লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় কিছু জেলে নামলেও এখনও অনেক জেলে জলদস্যুদের ভয়ে নদীতে নামতে পারছেন না। রামগতি থানার ওসি এ টি এম আরিচুল হক জানান, জলদস্যুনেতা জমিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদেরও গ্রেফতার করা হবে।

Tag :

পোস্টটি আপনার স্যোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

আপডেট এর সময় : ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ জুলাই ২০১৮
১২ বার পঠিত হয়েছে

লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় জলদস্যু আতঙ্কে জেলেরা

আপডেট এর সময় : ০৮:১৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ জুলাই ২০১৮

 

লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকারে পুরোদমে নেমেও জলদস্যু আতঙ্কে রয়েছেন জেলেরা। নদীতে নৌ পুলিশের তৎপরতা না থাকায় কয়েক দিন ধরে নৌকায় গণহারে ডাকাতি হচ্ছে। রামগতির চরআবদুল্লাহ মেঘনা নদী থেকে অপহরণের দু’দিন পর জেলে সাইফুল হাওলাদারের মৃতদেহ পুলিশ উদ্ধার করলেও নিখোঁজ রয়েছেন আবুল কালাম নামের আরেক জেলে। চাঁদার দাবিতে অপহরণের ঘটনায় জলদস্যু-আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আতঙ্কে রয়েছেন জেলেসহ নৌরুটে চলাচলকারী যাত্রীরাও। তবে পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিন বলেছেন, জেলেরা যেন নিরাপদে মাছ শিকার করতে পারেন, সে জন্য নদীতে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন জলদুস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। অন্যদিকে জেলেদের অভিযোগ, দস্যুদের অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া ও নদীতে জলদস্যু গ্রেফতার তৎপরতা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহে অত্যাচার সহ্য করে ও চাঁদা দিয়ে মাছ ধরছেন জেলেরা। জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় প্রায় ৪৬ হাজার জেলে রয়েছেন। তাদের মধ্যে নিবন্ধিত ২৭ হাজার ৮০০ জেলে। এদের অধিকাংশই মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল এলাকার ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত মেঘনা নদীতে মাছ শিকার করে থাকেন এখানকার জেলেরা। তবে জেলার রামগতির চরগজারিয়া, বয়ারচর, চরআবদুল্লাহ, তেলিরচর এবং তার আশপাশের জেলেরা নদীতে যাচ্ছেন না জলদস্যু ও ডাকাত-আতঙ্কে। কিছু জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে গেলে মারধর করে মাছ, জাল ও নৌকা নিয়ে যায়। বাধা দিলে ধরে নিয়ে আটকে রেখে তাদের ওপর নির্যাতন চালায় মুক্তিপণের জন্য। অনেক সময় এদের হাতে প্রাণও দিতে হচ্ছে নদীতে আসা জেলেদের। জানা গেছে, ২১ জুন রামগতির মেঘনার চরআবদুল্লাহ থেকে সাত জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় জলদুস্যরা। মুক্তিপণ আদায়ের পর মাঝনদীতে ছেড়ে দেওয়া হয়। পাঁচজন সাঁতার কেটে কূলে আসেন। দু’জন নিখোঁজ হন। এর দু’দিন পর সাইফুল হাওলাদার নামের একজনের লাশ উদ্ধার করা হলেও আবুল কালামের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। এভাবে প্রায়ই জলদস্যুদের হাতে হামলার শিকার হতে হয় জেলেদের।

রামগতির জেলে নেতা সামছুদ্দিন ও উদ্ধারকৃত জেলেদের স্বজনরা জানান, সাইফুল হাওলাদারসহ অন্য জেলেরা প্রতিদিনের মতো নদীতে মাছ শিকারে যান। গত ২১ জুন গভীর রাতে জলদস্যু কালা জাকের, জমির, বাদশা ও মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে জলদস্যুরা রামগতির চরআবদুল্লাহ মেঘনা নদী এলাকা থেকে সাত জেলেকে অপহরণ করে। এরপর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে তারা। মুক্তিপণের কিছু টাকা বিকাশের মাধ্যমে পাঠানো হয়। এরপর মেঘনা নদীতে ওই সাত জেলেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। গতকাল শুক্রবার দুপুরে সাঁতার কেটে জেলে ফারুক, রাসেল, বেলাল হোসেন, আমির হোসেন, কবির হোসেনসহ পাঁচজন কূলে এলেও সাইফুল হাওলাদার ও আবুল কালাম মাল নামের দুই জেলে নিখোঁজ হন। সকালে মেঘনার রামগতি এলাকায় সাইফুল হাওলাদারের লাশ ভাসতে দেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তার লাশ উদ্ধার করে। অপর জেলে আবুল কালাম এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। স্থানীয় মৎস্য আড়তদাররা অভিযোগ করে জানান, জেলেদের কাছ থেকে টোকেনের মাধ্যমে জলদস্যু ডাকাতরা চাঁদাবাজি করছে। প্রতি বর্ষায় নৌকাপ্রতি চাঁদা দিতে হচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। আর ঘাটে এক হালি মাছ বিক্রি করতে দিতে হয় তাদের ৫০ টাকা। এর বাইরেও আরও অনেক স্থানে চাঁদা দিতে হয় তাদের। জলদস্যুদের দাবি করা চাঁদা না দিলে নদীতে মাছ ধরতে গেলে হামলা, লুটপাট, অপহরণ, নির্যাতন ও পরে মুক্তিপণ দিয়ে তাদের কাছ থেকে মুক্তি মেলে। পুরোদমে লক্ষ্মীপুরের মেঘনায় কিছু জেলে নামলেও এখনও অনেক জেলে জলদস্যুদের ভয়ে নদীতে নামতে পারছেন না। রামগতি থানার ওসি এ টি এম আরিচুল হক জানান, জলদস্যুনেতা জমিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদেরও গ্রেফতার করা হবে।