ঢাকা , সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:

অসচেতনতায় ৯ বছরেও কার্যকর হয়নি উচ্চ আদালতের রায়

প্রতিনিধির নাম :
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জানান, দুই বছর শেষ হলেও সে জানে না— তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কোনো কমিটি আছে কি না। অথচ হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী এটা অবশ্যই থাকতে হবে। সিটি কলেজের দুই শিক্ষার্থীর তাদের কাছে জানতে চাইলে একই উত্তর আসে। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের কলেজে এমন কোনো কমিটি আছে বলে তাদের জানা নেই। কলেজের বর্তমান প্রিন্সিপালকে পাওয়া না গেলেও সাবেক প্রিন্সিপাল মাহবুবা রহমান জানান, ২০১৭ সাল পর্যন্ত তার সময়ে এই কমিটি করা হয়নি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্মান শেষ করা এক শিক্ষার্থী জানান, তার ৪ বছর পড়া অবস্থায় দুটি অভিযোগ অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একবার অন্য এক অনুষদের এক নারী শিক্ষকের আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঐ অনুষদের চেয়ারম্যানকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর একবার একই অনুষদের এক শিক্ষার্থীর আনীত অভিযোগে এক শিক্ষকের চাকরি চলে যায়। পিআইবিতে কর্মরত এক নারী এবং বেশ ছিকু গণমাধ্যম কর্মী এবং বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো সেল আছে বলে জানা নেই।
একাধিক বিজ্ঞজন বলেন, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার সাথে সাথে যৌন হয়রানি ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে নির্দেশনা প্রণয়ন করে। তারা মনে করেন, আমাদের আইন না মানার মানসিকতার ফলে কার্যকর হচ্ছে না নিদের্শনা। ফলে নারীর যৌন হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী-১৬৪ জন নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু ইত্তেফাককে বলেন, এটি শুধুই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রকাশ করা রিপোর্ট। কিন্তু আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে এবং জেলা শাখা অফিসের মাধ্যমে জানতে পারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। আমরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ব্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে নিজেরা গিয়ে এবং চিঠি দিয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন করতে বলছি। কিন্তু রায়টি নিয়ে সেভাবে প্রচারণা নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নিদের্শনাটিকে আইন করাও জরুরি।
‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ: আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা’ নিয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের চলতি বছর মে মাসে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ৩০ শিক্ষার্থী ও ২০ জন পেশাজীবীর উপর করা গবেষণায় দেখা যায় ৮৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের দিকনির্দেশনা জানেন না। পেশাজীবীদের মধ্যে এই হার ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। মূলত নির্দেশনার বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা ও না মানার কারণে এই তারা জানে না বলে মনে করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রিডিরেক্টর ফারাহ কবীর। ফারাহ কবীর বলেন, একটা ফাঁক রয়ে গেছে। শুরুর দিকে কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও পরে প্রচার-প্রসারের অভাবে আর অগ্রসর হয়নি। কি উদ্দেশ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশনাটি যে আইনের মতো কাজ করবে তা জানানোর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক বলেন, এটি একটি নজিরবিহীন নির্দেশনা। নির্দেশনায় বলা হয়, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যতদিন না একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন করা হবে, ততদিন পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ মতে এ নির্দেশনাই আইন হিসেবে কাজ করবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের সব কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। আইন না মানলে যেমন শাস্তি হয়, তেমন এই নির্দেশনা না মানলেও শাস্তি হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষিত মানুষ আইনের প্রতি সংবেদনশীল নয় বলে আইন মানেন না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্য করা আইন সমাজ সহজে মেনে নিতে চায় না।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সকল জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে এ বিষয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেত বলা হয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জানান হয়। কিন্তু এখনও মানুষ এ বিষয়ে সেভাবে সচেতন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের লোকবলের অভাব আছে। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই রায় কার্যকরভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
Tag :

পোস্টটি আপনার স্যোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

আপডেট এর সময় : ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮
১৪ বার পঠিত হয়েছে

অসচেতনতায় ৯ বছরেও কার্যকর হয়নি উচ্চ আদালতের রায়

আপডেট এর সময় : ০৬:৫১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৮
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জানান, দুই বছর শেষ হলেও সে জানে না— তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কোনো কমিটি আছে কি না। অথচ হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী এটা অবশ্যই থাকতে হবে। সিটি কলেজের দুই শিক্ষার্থীর তাদের কাছে জানতে চাইলে একই উত্তর আসে। বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের কলেজে এমন কোনো কমিটি আছে বলে তাদের জানা নেই। কলেজের বর্তমান প্রিন্সিপালকে পাওয়া না গেলেও সাবেক প্রিন্সিপাল মাহবুবা রহমান জানান, ২০১৭ সাল পর্যন্ত তার সময়ে এই কমিটি করা হয়নি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক সম্মান শেষ করা এক শিক্ষার্থী জানান, তার ৪ বছর পড়া অবস্থায় দুটি অভিযোগ অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। একবার অন্য এক অনুষদের এক নারী শিক্ষকের আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঐ অনুষদের চেয়ারম্যানকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর একবার একই অনুষদের এক শিক্ষার্থীর আনীত অভিযোগে এক শিক্ষকের চাকরি চলে যায়। পিআইবিতে কর্মরত এক নারী এবং বেশ ছিকু গণমাধ্যম কর্মী এবং বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত নারী কর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রতিষ্ঠানে এমন কোনো সেল আছে বলে জানা নেই।
একাধিক বিজ্ঞজন বলেন, কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ার সাথে সাথে যৌন হয়রানি ও নির্যাতন বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালে হাইকোর্টে নির্দেশনা প্রণয়ন করে। তারা মনে করেন, আমাদের আইন না মানার মানসিকতার ফলে কার্যকর হচ্ছে না নিদের্শনা। ফলে নারীর যৌন হয়রানির ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী-১৬৪ জন নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু ইত্তেফাককে বলেন, এটি শুধুই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে প্রকাশ করা রিপোর্ট। কিন্তু আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে এবং জেলা শাখা অফিসের মাধ্যমে জানতে পারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। আমরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ব্ববিদ্যালয়সহ অনেক প্রতিষ্ঠানে নিজেরা গিয়ে এবং চিঠি দিয়ে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠন করতে বলছি। কিন্তু রায়টি নিয়ে সেভাবে প্রচারণা নেই। সরকারের পক্ষ থেকেও পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। নিদের্শনাটিকে আইন করাও জরুরি।
‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ: আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা’ নিয়ে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের চলতি বছর মে মাসে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ৩০ শিক্ষার্থী ও ২০ জন পেশাজীবীর উপর করা গবেষণায় দেখা যায় ৮৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের দিকনির্দেশনা জানেন না। পেশাজীবীদের মধ্যে এই হার ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। মূলত নির্দেশনার বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা ও না মানার কারণে এই তারা জানে না বলে মনে করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রিডিরেক্টর ফারাহ কবীর। ফারাহ কবীর বলেন, একটা ফাঁক রয়ে গেছে। শুরুর দিকে কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও পরে প্রচার-প্রসারের অভাবে আর অগ্রসর হয়নি। কি উদ্দেশ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশনাটি যে আইনের মতো কাজ করবে তা জানানোর জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক বলেন, এটি একটি নজিরবিহীন নির্দেশনা। নির্দেশনায় বলা হয়, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যতদিন না একটি পৃথক ও পূর্ণাঙ্গ আইন করা হবে, ততদিন পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ মতে এ নির্দেশনাই আইন হিসেবে কাজ করবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের সব কর্মক্ষেত্র এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই নির্দেশনা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। আইন না মানলে যেমন শাস্তি হয়, তেমন এই নির্দেশনা না মানলেও শাস্তি হবে। তিনি আরও বলেন, শিক্ষিত মানুষ আইনের প্রতি সংবেদনশীল নয় বলে আইন মানেন না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্য করা আইন সমাজ সহজে মেনে নিতে চায় না।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার সাথে সাথে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে সকল জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে এ বিষয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেত বলা হয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে জানান হয়। কিন্তু এখনও মানুষ এ বিষয়ে সেভাবে সচেতন নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের লোকবলের অভাব আছে। তাই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই রায় কার্যকরভাবে পালনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।