জাতিসংঘে শত্রু-মিত্রদের সমালোচনা করতে পারেন নেতানিয়াহু
নিজ দেশে কঠিন পুনর্নির্বাচন প্রচারণার মুখে থাকা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যেসব শত্রু ও মিত্র তাঁর বিরোধিতা করেছে, ভাষণে তিনি তাদের সমালোচনা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের একটি গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনায় ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটারের ছেলে ও এক সেনা গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনাটিও নেতানিয়াহু তাঁর ভাষণে তুলে ধরতে পারেন।
জাতিসংঘ থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
নিউইয়র্কে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান সমালোচক শহরটির মেয়র জোহরান মামদানি। জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে অংশ নিতে নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে এলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করার অঙ্গীকার করেছিলেন মামদানি।
হেগভিত্তিক আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৪ সালে বলেছিল, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের প্রাণঘাতী হামলার জবাবে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে নেতানিয়াহু কথিত যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ীÑএমন বিশ্বাস করার মতো যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। তবে নেতানিয়াহু আইসিসির এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পরে মামদানি স্বীকার করেন, এ ধরণের পদক্ষেপ নেওয়ার আইনগত ক্ষমতা তাঁর নেই। এতে নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকেরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সপ্তাহে (হাইলেভেল উইক) ভাষণ দেওয়ার আগে নেতানিয়াহু মামদানিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আমি আপনাদের সম্পর্কে সত্য কথা বলব।’ তিনি মামদানির বিরুদ্ধে ‘হামাসের সন্ত্রাসী দানবদের সমর্থন করার’ অভিযোগ করেন।
এ ছাড়া তিনি কোনো ভিত্তি ছাড়াই মামদানির বিরুদ্ধে ‘নিউইয়র্কের ইহুদিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গায় উসকানি দেওয়ার’ অভিযোগ করেন।
ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করে আসা এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলা মামদানি মঙ্গলবার এর জবাবে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ওই ভিডিওতে যা বলেছেন, তা সত্য নয়Ñএটা আমরা সবাই জানি।’
নেতানিয়াহুর অন্যতম কঠোর সমালোচক ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘের অধিবেশনকক্ষে থাকবেন না। ওয়াশিংটন তাঁকে অংশগ্রহণের জন্য ভিসা দেয়নি।
ইসরাইলের সাবেক মিত্র ব্রিটেন ও ফ্রান্সও বৃহস্পতিবার নেতানিয়াহুর সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ইসরাইলি পণ্য রপ্তানির ওপর ব্রিটেন সীমিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সম্প্রতি ফ্রান্সও একই ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে।
পশ্চিম তীরে হামাস সক্রিয় নয় বলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ মন্তব্য করায় ইসরাইল ক্ষুব্ধ হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে গাজাই হামাসের প্রধান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় মাখোঁর ওই মন্তব্যকে ‘চরম হাস্যকর’ বলে আখ্যায়িত করে। কার্যালয়টি আরও বলেছে, হামাস ‘প্রায় প্রতিদিনই ইহুদিদের ওপর হামলা চালায়।’
কার্যালয়টি বলেছে, ‘তারা জুডিয়া ও সামারিয়ায় অসংখ্য ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে।’ পশ্চিম তীরকে ইসরাইল বাইবেলের নাম জুডিয়া ও সামারিয়া বলে অভিহিত করে। ১৯৬৭ সালে ইসরাইল অঞ্চলটি দখল করে।
গত বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পশ্চিমা দেশগুলোকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ায় মাখোঁর সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক এমনিতেই ভালো ছিল না।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ চলছে। নেতানিয়াহুর ভাষণে ইরান প্রায় নিশ্চিতভাবেই গুরুত্ব পাবে।
ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সে জন্য দেশটিতে আরও ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ দিচ্ছে ইসরাইল।
-জাতিসংঘের তীব্র সমালোচনা-
তবে যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে জনপ্রিয় নয়। যুদ্ধের পর জ্বালানির দামও বেড়েছে।
বুধবার ইরানের প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার পর জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি দানন বলেন, তেহরান ‘লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনে হুতিদের, গাজা ও জুডিয়া-সামারিয়ায় হামাস এবং ইরাকে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র দেয়।’
তিনি ইরানকে এমন একটি ‘শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করেন, ‘যা নিজ দেশের নাগরিকেরা প্রতিবাদ করার সাহস করলে তাদের হত্যা করে।’
নেতানিয়াহু জাতিসংঘ এবং বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসেরও তীব্র সমালোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে তিনি গুতেরেসের ধারাবাহিক সমালোচক।
অস্বাভাবিকভাবে, গুতেরেস এ সপ্তাহে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক পদক্ষেপের পূর্ণ নাম উল্লেখ করেন। এসব পদক্ষেপে গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
নেতানিয়াহু সরকার বারবার জাতিসংঘের একটি সংস্থার বিরুদ্ধে হামাসের যোদ্ধাদের আড়াল করার অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, সংস্থাটির কয়েকজন কর্মী ইসরাইলে হামাসের ওই হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। ওই হামলাই গাজায় যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হলেও ইসরাইল গাজায় বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, অঞ্চলটির পুনর্গঠন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করছে দেশটি।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার ভারপ্রাপ্ত কমিশনার-জেনারেল ক্রিশ্চিয়ান সন্ডার্স এ সপ্তাহে এএফপিকে বলেন, ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য গাজায় ইঞ্জিনের তেলের মতো জরুরি সরবরাহ প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরাইল ‘অত্যন্ত কঠিন’ আচরণ করছে। অথচ বিলাসবহুল বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
সন্ডার্স বলেন, ‘আমার মনে হয়, ইসরাইলি সরকার তাদের জনগণকে বোঝাতে চাইছে, কেন তাদের আবার নির্বাচিত করা উচিত।’
আগের বছরগুলোর মতো এবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় ভেতরে ও বাইরে বিক্ষোভ হতে পারে। তাঁর নীতির প্রতিবাদে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি অধিবেশনকক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে পারেন। পাশাপাশি বাইরে বিক্ষোভকারীরাও জড়ো হতে পারেন।
ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।




















