ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:
Logo ইরান কখনো মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান Logo জাতিসংঘে শত্রু-মিত্রদের সমালোচনা করতে পারেন নেতানিয়াহু Logo ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে: মাহদী আমিন Logo এআইয়ের নাম পাল্টে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ বা এসআই রাখছেন ট্রাম্প Logo বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যয় Logo মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ Logo হুতিদের ‘অবিলম্বে সব সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জি৭ নেতাদের Logo তুরস্কে স্কুলের বাইরে গুলিতে আহত ৪ শিক্ষার্থী Logo সীমিত সম্পদের ভারসাম্য রক্ষায় জ্বালানি খাতে ভর্তুকি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত : তথ্য উপদেষ্টা

খোকা : মুক্তিযোদ্ধা থেকে জননেতা

প্রতিনিধির নাম :

দেশে শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ছিলেন অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে খোকা খ্যাতিমান ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মেয়র থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঢাকার বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করেছিলেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধারা কে কোন দল করে তা কখনও দেখেননি খোকা। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ই ছিল সবচেয়ে বড়।

১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক অপারেশন পরিচালনা করেন সাদেক হোসেন খোকা।

১৯৭১-এর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা রুহুল আমীন এবং গোপীবাগের মাসুদসহ (বুড়া) বেশ কয়েকজন মিলে প্রথমে খোকারা যান নরসিংদীর শিবপুরে। সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর যুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য আগরতলার পৌঁছলে তাদের রিসিভ করেন শহীদুল্লাহ খান বাদল (রাশেদ খান মেননের ছোট ভাই)।

মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং শেষে খোকারা সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন গাফফারের (পরে জাতীয় পার্টি নেতা ও মন্ত্রী) নেতৃত্বাধীন সাব সেক্টরে। ওখানে ট্রেনিং শেষ করার পর প্রথমদিকে কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) যুদ্ধের ৯ মাসই প্রতিদিন এক বা একাধিক অপারেশনে অংশ নিয়েছেন সাদেক হোসেন খোকা।

৮০’র দশকে তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগদান করেন। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতিসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন খোকা।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। পুরান ঢাকার নয়াবাজার নবাব ইউসুফ মার্কেটে বিএনপির কার্যালয় থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন ৭ দলীয় জোটের নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এই কঠোর আন্দোলনের ঢাকা মহানগর সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন খোকা। বিভিন্ন সময় আন্দোলনে রাজপথের এই রাজনীতিবিদ প্রতিপক্ষের হামলায় রক্তাক্তও হন।

১৯৯০ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে পুরান ঢাকার মানুষের মনে আস্থার জায়গা করে নেন।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। এ সময় তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকা নির্বাচিত হন। দিনে দিনে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ঢাকার রাজনীতিতে খোকা ফ্যাক্ট হয়ে ওঠেন।পরে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রায় পাঁচ বছর একক নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হন। ওই সময় পুরান ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে নিজস্ব বলয় তৈরির পাশাপাশি প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে দলকে শক্তিশালী করার পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এর আগে ১৯৯৪ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফের কাছে পরাজিত হন মির্জা আব্বাস। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দল কঠোর আন্দোলন শুরু করলে ঢাকায় বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় খোকাকে ১৯৯৬ সালে মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকার মেয়র ছিলেন।

Tag :

পোস্টটি আপনার স্যোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

আপডেট এর সময় : ০১:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০১৯
২১ বার পঠিত হয়েছে

খোকা : মুক্তিযোদ্ধা থেকে জননেতা

আপডেট এর সময় : ০১:০১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৪ নভেম্বর ২০১৯

দেশে শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ছিলেন অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে খোকা খ্যাতিমান ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। মেয়র থাকাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের নামে ঢাকার বিভিন্ন সড়কের নামকরণ করেছিলেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধারা কে কোন দল করে তা কখনও দেখেননি খোকা। একজন মুক্তিযোদ্ধার কাছে মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ই ছিল সবচেয়ে বড়।

১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ছিলেন গেরিলা যোদ্ধা। পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক অপারেশন পরিচালনা করেন সাদেক হোসেন খোকা।

১৯৭১-এর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা রুহুল আমীন এবং গোপীবাগের মাসুদসহ (বুড়া) বেশ কয়েকজন মিলে প্রথমে খোকারা যান নরসিংদীর শিবপুরে। সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর যুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার জন্য আগরতলার পৌঁছলে তাদের রিসিভ করেন শহীদুল্লাহ খান বাদল (রাশেদ খান মেননের ছোট ভাই)।

মেজর হায়দারের অধীনে তিন সপ্তাহ গেরিলা ট্রেনিং শেষে খোকারা সম্মুখ যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন গাফফারের (পরে জাতীয় পার্টি নেতা ও মন্ত্রী) নেতৃত্বাধীন সাব সেক্টরে। ওখানে ট্রেনিং শেষ করার পর প্রথমদিকে কসবা-মন্দভাগ (মির্জাপুর) যুদ্ধের ৯ মাসই প্রতিদিন এক বা একাধিক অপারেশনে অংশ নিয়েছেন সাদেক হোসেন খোকা।

৮০’র দশকে তিনি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিতে যোগদান করেন। অবিভক্ত ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতিসহ দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন খোকা।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নায়ক ছিলেন তিনি। পুরান ঢাকার নয়াবাজার নবাব ইউসুফ মার্কেটে বিএনপির কার্যালয় থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেন ৭ দলীয় জোটের নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এই কঠোর আন্দোলনের ঢাকা মহানগর সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন খোকা। বিভিন্ন সময় আন্দোলনে রাজপথের এই রাজনীতিবিদ প্রতিপক্ষের হামলায় রক্তাক্তও হন।

১৯৯০ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে পুরান ঢাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে পুরান ঢাকার মানুষের মনে আস্থার জায়গা করে নেন।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৭ আসনে (সূত্রাপুর-কোতোয়ালি) শেখ হাসিনাকে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়ে আলোচনায় আসেন। এ সময় তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঢাকার আটটি আসনের মধ্যে সাতটিতে বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হলেও একমাত্র খোকা নির্বাচিত হন। দিনে দিনে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ঢাকার রাজনীতিতে খোকা ফ্যাক্ট হয়ে ওঠেন।পরে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রায় পাঁচ বছর একক নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হন।

২০০১ সালের নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদমন্ত্রী হন। ওই সময় পুরান ঢাকায় বিএনপির রাজনীতিতে নিজস্ব বলয় তৈরির পাশাপাশি প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে দলকে শক্তিশালী করার পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

এর আগে ১৯৯৪ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ হানিফের কাছে পরাজিত হন মির্জা আব্বাস। বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য বিরোধী দল কঠোর আন্দোলন শুরু করলে ঢাকায় বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় খোকাকে ১৯৯৬ সালে মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি ঢাকার মেয়র ছিলেন।