
নিজস্ব প্রতিনিধি :
এখন যৌবন যার মিছিলে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অসাধারণ অবদানে স্বৈরাচার পতনের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। সকল শিক্ষার্থীদের সাথে আপামর বাংলাদেশের জনগণ এ লড়াইয়ে জয়লাভ করেছে। স্বৈরাচার পতনের পর এখন সময় রাষ্ট্র গড়ার, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোন পথে হাঁটছি…? ছাত্রদের কাঁধে বন্দুক রেখে বেশ কিছু মহল তাদের স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের ছক কষে রেখেছে। কথাগুলো হচ্ছে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। যেখানে বেশ কিছু ক্ষমতালোভী পিপাসু নিজেদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও ক্ষমতায় আসীন হওয়ার নেশায় মত্ত হয়ে ছাত্রদের ভিতরে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীল পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। তাদের ক্ষমতার লোভের শিকার হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চলমান শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার পরিবেশ ক্রমান্বয়ে ব্যাহত হচ্ছে। কিছু অসাধু মহলের প্ররোচনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি করছে এবং এরই বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তারা বারবার রাস্তায় নেমে এসেছে। এসব অসাধু মহলের চক্রান্তের কারণে প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই। যেসব সাধারন শিক্ষার্থীরা প্রকৃতপক্ষে পড়াশোনা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন করে তাদের চলমান সেমিস্টারের স্বাভাবিক সচলাবস্থা ও শিক্ষা কার্যক্রম চরম শঙ্কার মুখে পতিত হয়েছে। বিভিন্ন নেতিবাচক প্রচারণার ফলে সর্বোপরি প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ইমেজ সংকটে পড়েছে এবং চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করে নিজেদের ক্ষমতার লোভ ও স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের চেষ্টায় যারা মত্ত হয়েছে তারা আসলে কারা, তাদের খুঁজে বের করা খুবই জরুরী। এসব দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের লড়াইয়ে টিকে থাকার প্রশ্নে এক হয়ে নিজেদের মুক্ত করতে পারে।
সূত্রে জানা যায়, প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৩ সালের প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে পূর্বের কিছু স্বার্থান্বেষী মহল অর্থ আত্মসাৎ ছাড়াও নানাবিধ অবৈধ কার্যক্রমের সাথে জড়িত ছিল। প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ৯০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট প্রতিষ্ঠান হুদাভাসির অডিট রিপোর্টে বেরিয়ে এসেছে, যা সুদসহ ১৬৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার এ কে এম আশরাফুল হক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবুল কাশেম মোল্লা এসব ব্যাপারে অবহিত ছিলেন এবং তাদের কাছ থেকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদয় অর্থ পাওনা রয়েছে। এছাড়াও তৎকালীন ট্রেজারার এ কে এম আশরাফুল হক নারী কেলেঙ্কারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হন। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর আব্দুল হান্নান চৌধুরীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা না। ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্টের টাকা এগুলো। আর এই টাকা ২০১০ সালের দিকে নেওয়া হয়েছে। আমি ২০১৭ সালে এসে ট্রাস্টি বোর্ড সভায় এ বিষয়ে আলাপ হতে দেখেছি। ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যাপার হওয়ায় এখানে আমার বলার বা করার কিছু থাকে না। অর্থাৎ এই আত্মসাৎকৃত টাকা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বা এডমিশন ফি বাবদ নয়, এটি ফাউন্ডেশন ও ট্রাস্টি বোর্ডের টাকা ছিল।
অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ মাথায় নিয়ে ২০১৮ সালের ১৪ নভেম্বর প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টিবোর্ড এর চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ পত্র জমা দেন এম এ খালেক। একই বছরের ১০ ডিসেম্বর ট্রাস্টি বোর্ডের ১৭ তম সভায় পদত্যাগ পত্র গৃহীত হয়। সে সভায় প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের নতুন চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান মোঃ নজরুল ইসলাম ৫ কোটি টাকা প্রদান করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজার্ভ ফান্ড গঠনের জন্য, যেটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আবশ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ মোতাবেক।
পরবর্তীতে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্তাকর্তা বনে যান তৎকালীন ওয়েবসাইটে দেওয়া প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রায়হান আজাদ টিটু, যদিও তার এ পদটি বৈধ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। টিটুর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম- দুর্নীতিসহ নারীঘঠিত ব্যাপারে অভিযোগ রয়েছে। তিনি তার নিজস্ব কিছু লোকবল নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। এ সিন্ডিকেট নিয়োগ, কেনাকাটা, মেনটেনেন্সসহ নানা কাজে হস্তক্ষেপ করে লাখ লাখ টাকার সুবিধা নিয়েছে। এমনকি এই সিন্ডিকেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিষ্ঠিত সিকিউরিটি কোম্পানি গ্রুপ ফোর কে বাদ দিয়ে নিজেদের পরিচিত কোম্পানি কে নিয়োগ দিয়েছে, এবং তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিজের কাছের লোক হিসেবে মোহাম্মদ সোহেল খানকে চিফ সিকিউরিটি অফিসার হিসেবে নিয়োজিত করেন। তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান রায়হান আজাদ টিটুর স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তা লুৎফুল বলেন উনি নিজে তো কিছু করতেন না। বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে করাতেন। ক্যাম্পাসের ওয়েটিং রুম ও ক্যান্টিন নিয়েও অনিয়ম হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক ক্রয় কর্মকর্তা ইকবাল বলেন, পুরো ক্রয়, স্টোর ও নিরাপত্তার দায়িত্বরত সকল কর্মকর্তাকে ছাটাই করা হয়েছে। পরবর্তীতে এসব অনিয়মের অভিযোগে রায়হান আজাদ টিটুকে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় হতে অপসারণ করা হয়। এছাড়াও এসব অনিয়মে জড়িত ছিলেন শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার বান্ধবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ড. শুভময় দত্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বরখাস্তকৃত অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক শিপার আহমেদ। এখানে উল্লেখ্য যে, ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় নিজের রাজনৈতিক পরিচয় এভাবে তুলে ধরতেন যে তিনি বাল্যকাল থেকে শেখ রেহানার বান্ধবী ছিলেন এবং ওই মতাদর্শে বিশ্বাসী। এমনকি তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে এমপি ইলেকশনে দাঁড়াবার জন্য নমিনেশন প্রত্যাশী ছিলেন এবং বিভিন্ন সূত্রে লবিং করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের পক্ষে নমিনেশন পাননি। পরবর্তীতে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ছাত্রদের সমর্থন পাবার আকাঙ্ক্ষায় অত্যন্ত সুকৌশলে হঠাৎ করে আওয়ামী পন্থী থেকে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষের অনুসারী হিসেবে নিজেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিষ্কৃত অর্থ ও হিসাব শাখার পরিচালক সিপার আহমেদ সেই ব্যক্তি যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ ৫৬ টির উপরেও মামলা রয়েছে বেসিক ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির কারণে তৎকালীন ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার থাকাকালীন। এবং এই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের ঋণ খেলাপের অভিযোগে রায়হান আজাদ টিটুর বিরুদ্ধে দুদুকে তদন্ত ও তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান।
অর্থ ও হিসাব শাখার বহিষ্কৃত পরিচালক শিপার আহমেদ ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ভর্তি ফি ও অন্যান্য ফি বাবদ জমাকৃত টাকা থেকে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা টোকেন পেপারে স্বাক্ষর করে ভর্তি শাখা থেকে নিয়ে গিয়েছেন। আর এসব অনিয়মে অভিযুক্তদের সহায়তা করেছেন প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও বিপণন শাখার বরখাস্তকৃত সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ সরকার, একই শাখা থেকে পদত্যাগ করা সহকারী পরিচালক জুবায়ের সিদ্দিক তানিন, রসুল আহমেদ রাসেল, প্লানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের হাসিবুল ইসলাম, তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী হাসিবুর রহমান ও ক্রয় বিভাগ থেকে পদত্যাগ করা সহকারী পরিচালক নাহিদ হাসান ।
এছাড়াও এসব অপকর্মের সহায়তা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন খন্ডকালীন শিক্ষক: এমবিএ প্রোগ্রামের সাবেক খন্ডকালীন শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন ও সায়েদ ফেরদৌস মুগ্ধ। তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান রায়হান আজাদ টিটুর সাথে সখ্যতা থাকার কারণে সাবেক খন্ডকালীন শিক্ষক ফারহানা ইয়াসমিন বিভিন্ন সময় প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন। কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এবং রিসার্চ, জার্নাল ও পাবলিকেশন না থেকেও স্বল্প সময়ের ভিতরে ফারহানা ইয়াসমিন সহকারী অধ্যাপক বনে যান।
যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এভাবেই রায়হান আজাদ টিটু নিজের ঘনিষ্ঠ লোকদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন। এরকম একজন সাবেক সহকারী পরিচালক মাইনুল হোসেন যিনি রায়হান আজাদ টিটুর আস্থাভাজন হওয়ায় প্রথমে অর্থ ও হিসাব শাখা ও পরে ভর্তি শাখায় দায়িত্ব পালন করেন।
সাবেক সহকারী পরিচালক মাইনুল হোসেন তার পূর্বের প্রতিষ্ঠানে আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে চাকরিচুত হন। এবং প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থাকাকালীন ভর্তি ও সার্টিফিকেট বাণিজ্য চক্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন, সাবেক সহকারি পরিচালক মাইনুল হোসেন শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর আড়ালে বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীর সাথে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ভালো গ্রেডসহ সার্টিফিকেট বিক্রির বাণিজ্য শুরু করেন। এসব কতিপয় দুর্নীতির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অসাধু শিক্ষকও জড়িত।
প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মানাধীন স্থায়ী ক্যাম্পাস, নিরাপত্তা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন অফিসের সাজসজ্জা, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি শাখার মাধ্যমে ভর্তি ফি নগদ গ্রহণ করার মাধ্যমে এসব আর্থিক অনিয়ম করা হয়েছে। এছাড়াও অনিয়ম করা হয়েছে বিভিন্ন আসবাবপত্র ক্রয়, বিজ্ঞাপন প্রচার, গাড়ি ক্রয় ও মেনটেনেন্স ক্রয় এবং বিভিন্ন গবেষণাগারের সামগ্রিক ক্রয় করাসহ নানা খাতে। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পোর্টস ক্লাবের সদস্য পদ বিক্রির অর্থ নিয়েও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যার হিসাব স্পোর্টস ক্লাবের সাথে যুক্ত কেউ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দিতে পারেনি।
এভাবে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অর্থনৈতিক অনিয়ম ও অভিযোগের তথ্য ফাঁস হওয়ার প্রেক্ষিতে যেসব কর্মকর্তা বহিঃস্কৃত হয়েছে বা পদত্যাগ করেছে তারা তাদের ব্যাক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার হিসেবে আর্থিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা রয়েছে এমন কাউকে নিয়োগের শর্ত থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মানবিক বিভাগের শিক্ষকতা করা ড. ইফফাত জাহানকে। তার অদক্ষতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে ভেঙে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো। এছাড়া এসব অনিয়মের কারণে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি স্হায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের স্বপ্নও বাধাপ্রাপ্ত হয়। রায়হান আজাদ টিটুর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ইনফিকম এস এ কন্সট্রাকশন বাংলাদেশ লিমিটেড নামক ভুঁইফোর একটি কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য এবং কোন ধরনের অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে দরপত্র আহ্বান না করে। যেখানে কোম্পানিটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েক কোটি টাকা নিলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডিপার্টমেন্ট স্থানান্তর করার মতো কাজ সম্পাদন করেনি চুক্তি মোতাবেক। কাজের অগ্রগতি ইচ্ছাকৃতভাবে শিথিল করে রাখে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য। বিগত ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এ চুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান। এখানেও টিটু- শিপার চক্রের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজেদের একান্ত বিশ্বস্ত লোক হিসেবে শিপার আহমেদের ভাই সাকিব আহমেদকে সহকারি রেজিস্ট্রার, রেজিস্ট্রার অফিসে নিয়োগ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়, যার মূল দায়িত্বই দেওয়া হয়েছিল স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ তদারক করা যদিও তার এ বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বা অভিজ্ঞতা ছিল না।
শিপার আহমেদের ভাই এই সাকিব আহমেদের বিরুদ্ধেও শিপার আহমেদের মত বেসিক ব্যাংকের মানি লন্ডারিং মামলা চলমান। সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার সাকিব আহমেদ তার ভাই বরখাস্তকৃত পরিচালক শিপার আহমেদের প্রভাব খাটিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্বে নিয়োজিত হন। বর্তমানে পরিস্থিতি দেখে যেটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের গতি এতটা শ্লথ হওয়ার পিছনে কাদের এজেন্ডা কাজ করেছে এবং কারা ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক লাভবান হওয়ার লোভে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ- কে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান, টিটু- শিপার চক্রের এসব কর্মকাণ্ডের সময় ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার পরও এসব অন্যায়- দুর্নীতির বিরুদ্ধে কখনো তাকে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে জানানো হয়েছে, বরং তিনি এসব কর্মকান্ডে ও তৎসংলগ্ন বিলের অনুমোদন দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহানের একান্ত বিশ্বস্ত ও আস্থাভাজন হিসেবে সহকারী পরিচালক নাজলা হোসেন, ইন্টারনাল অডিট অনেক প্রশ্নবিদ্ধ ডকুমেন্ট অডিট নিরীক্ষা- পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্য ব্যতীত এবং অনেক ক্ষেত্রেই অডিট আপত্তি না দিয়েই অগ্রচালিত করে দিয়েছেন।
এসব নানাবিধ খাতে আর্থিক দুর্নীতি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্বে থাকা নাজলা হোসেন কোন অডিট রিপোর্ট বা তথ্য উপাত্ত প্রদান করেননি। এমনকি অনেক প্রশ্নবিদ্ধ বিল সহকারি পরিচালক নাজলা হোসেন, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক ছেড়ে দেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায় যে, এ সকল দুর্নীতি- অনিয়মের তথ্য প্রমাণাদি রিপোর্ট করার জন্য যে অডিট ফার্মকে ফরেনসিক অডিট করার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছিল সেই অডিট ফার্মের অন্যতম পার্টনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক নাজলা হোসেনের পূর্ব- পরিচিত হওয়ায় ট্রেজারার এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক হিসেবে তাদের দায়বদ্ধতা এড়াবার জন্য অগ্রসর হন। ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক নাজলা হোসেন এই শঙ্কায় ছিলেন যে, এসব অনিয়ম- দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের নির্লিপ্ততা এবং অপেশাদারিত্ব আচরণ ফরেনসিক অডিট রিপোর্টে বের হয়ে আসবে এবং এসব বিষয়ে জড়িত থাকার ব্যাপারটিও প্রমাণিত হয়ে যাবে। আর যেহেতু বিভিন্ন তদন্ত রিপোর্টে বারবার উঠে এসেছে যে, ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান তার দায় এড়াতে পারেন না তাই ট্রেজারার, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষক নাজলা হোসেনের সহায়তায় উক্ত অডিট ফার্মের সদস্যরা যেন সম্পূর্ণ অডিট শেষ না করেই বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে চলে যান তা নিশ্চিত করেন।
স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণে পার স্কোয়ার ফিটে দিগুন তিনগুণ বেশি করে অর্থ ধার্য করে রায়হান আজাদ টিটুর পরিচিত ইনফিকম এস এ কন্সট্রাকশন বাংলাদেশ লিমিটেড, এটি কাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সেটি অনুমেয়। ভর্তি তদন্ত কমিটিও মতামত প্রদান করে যে, ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহান এসব আর্থিক দুর্নীতির দায় কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। যেই ফারিস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের আর্থিক দুর্নীতি নিয়ে এত অভিযোগ একসময় ট্রেজারার ড. ইফফাত জাহানও সেই প্রতিষ্ঠানের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
এ সকল কারণে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবীকৃত স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমানে প্রয়োজন সঠিক পদ্ধতিতে দরপত্র আহবানের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান দ্বারা স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ ঘনীভূত করে কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহল অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার কুটকৌশল রচনা করছে। তাদের কাছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ও ক্যারিয়ারের কোন মূল্য নেই, তারা শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের কাজেই নিয়োজিত।
এ সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য The Daily Campus, দৈনিক দেশ রূপান্তর, Business Hour 24.com, শেয়ার বার্তা, Daily Sun, New Age BD, The Daily PAU সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও ধরাছোঁয়ার বাহিরে থেকে গেছে দুষ্কৃতিকারী, কষে গেছেন একের পর এক স্বার্থসিদ্ধির ছক।
তাই সকল দুর্নীতি ও প্ররোচনার বেড়াজাল ভেঙে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে প্রাইম এশিয়ানদের স্বার্থ রক্ষা করবেন প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা, এমনটাই প্রত্যাশা করেন শিক্ষানুরাগীরা।