মিয়ানমারে গণহত্যা

মিয়ানমারের একগুঁয়েমির কারণে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই জটিল রূপ ধারণ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, মিয়ানমার মুখে প্রত্যাবাসনের কথা বললেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। তিনি অবিলম্বে জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পাদিত চুক্তি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহে কাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবের পক্ষে পড়েছে ৩৫ ভোট, বিপক্ষে পড়েছে মাত্র তিনটি ভোট (চীন, ফিলিপাইন ও বুরুন্ডি) এবং সাতটি দেশ (জাপান, নেপাল, অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া, কেনিয়া, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা) ভোটদানে বিরত থাকে। ফলে শিগগিরই তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, একীভূত করা, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি কাঠামো সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। এর ফলে আইসিসি বা অন্য কোনো ট্রাইব্যুনালে মিয়ানমারে গণহত্যার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের পথ সুগম হবে। মিয়ানমার একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছে। বৃহৎ শক্তির মধ্যে শুধু চীনই প্রস্তাবের বিপক্ষে সরব ছিল।
রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে একটি সমাধানে পৌঁছার চেষ্টা করে আসছিল। প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে প্রায় এক বছর আগে দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তিও সই হয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যত তারা কোনো উদ্যোগই নেয়নি; বরং তাদের কর্মকা-ে সময়ক্ষেপণের কৌশলই স্পষ্ট হয়। এদিকে সর্বশেষ রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনা বিশ্ববিবেককে যথেষ্ট আহত করে। সারা দুনিয়া প্রতিবাদে মুখর হয়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অনেক বিশ্বনেতাই একে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। সর্বশেষ জাতিসংঘের গঠন করা স্বাধীন সত্যানুসন্ধান দলের প্রতিবেদনেও মিয়ানমারের ‘গণহত্যার অভিপ্রায়’ স্পষ্ট হয়েছে। এরই ভিত্তিতে এখন পরিচালিত হবে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কর্মকা-। যখনই বিচার হোক, এসব তথ্য-প্রমাণ সেখানে ব্যবহৃত হবে।
মিয়ানমার ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে, তার পরও তাদের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসছে না। মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চিকে একসময় গণতন্ত্রের মানসকন্যা বলা হতো। এখন তাঁকে দেওয়া শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি উঠছে। অনেক দেশ তাঁর সম্মানসূচক নাগরিকত্বসহ অন্যান্য সম্মান প্রত্যাহার করেছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কানাডার পার্লামেন্ট সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিয়ে সু চির নাগরিকত্ব বাতিল করেছে। তার পরও সু চি এখনো সেনা কর্মকর্তাদের সাফাই গেয়ে চলেছেন। আর জেনারেলরা শূন্যে হাত-পা ছুড়ে চলেছেন। অনেকেই মনে করে, তাঁদের এমন মনোভাবের কারণ শুধু চীনের সমর্থন। চীন বাংলাদেশেরও বন্ধু রাষ্ট্র। আমরা আশা করি, চীন মিয়ানমারকে শুধু সমর্থন না দিয়ে রোহিঙ্গা সংকটের একটি স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। সমস্যার উদ্ভব যেহেতু মিয়ানমারে, সমাধানও তাদেরই করতে হবে। আমরা চাই, মিয়ানমার সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসুক এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান হোক।
























