ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ সংবাদ:
Logo কোয়ার্টার ফাইনালে কাল বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ মালয়েশিয়া Logo সাতক্ষীরার কুড়িকাহুনিয়ায় বেড়িবাঁধে ভাঙন; স্বেচ্ছাশ্রমে সংস্কার কাজ শুরু Logo ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পের পর বেঁচে যাওয়া মানুষের সংগ্রাম Logo ইরানের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করায় তেলের দাম বাড়ল Logo স্বার্থ সংরক্ষণে জাতীয় পর্যায়ে কৃষকদের কেন্দ্রীয় সংগঠন গড়ে তোলার আহ্বান রাষ্ট্রপতির Logo জাতিসংঘ সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী Logo ইরান কখনো মাথা নত করবে না: পেজেশকিয়ান Logo জাতিসংঘে শত্রু-মিত্রদের সমালোচনা করতে পারেন নেতানিয়াহু Logo ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও নিরাপদ ও টেকসই বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর Logo বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে: মাহদী আমিন

ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম এক অনন্য ও সুমধুর ঐতিহ্যের নাম হলো ‘আজান’

প্রতিনিধির নাম :

অনলাইন ডেস্ক:   ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম এক অনন্য ও সুমধুর ঐতিহ্যের নাম হলো ‘আজান’। ‘আজান’ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো-আহ্বান করা, ঘোষণা করা। আজান শুধু নামাজের সময় জানিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম, তা কিন্তু নয়; বরং মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য ঘোষণা। আজানের যে চিরন্তন ধ্বনি প্রতিদিন আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি বিলায়, তার সূচনার ইতিহাস যেমন চমৎকার, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। তাইতো মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১ খ্রি.) তার বিখ্যাত ‘আজান’ কবিতায় আজানের সুমধুর ধ্বনি ও আধ্যাত্মিক মহিমাকে তুলে ধরে লিখেছেন-

‘হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,

কী যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-

কত সুধা আছে সেই মধুর আজানে!’

আসুন তবে জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কীভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে আজানের এ পবিত্র প্রবর্তন হয়েছিল-

মদিনায় মসজিদে নববী নির্মাণের পর হজরত রাসূল (সা.)-এর ইমামতিতে সাহাবিরা প্রতি ওয়াক্ত জামাতে নামাজ আদায় করতেন; কিন্তু সেসময় ঘড়ির প্রচলন না থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দিল। রাসূল (সা.) এ সমস্যা সমাধানের জন্য সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভার আহ্বান করলেন। সভায় সাহাবিদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব এলো। কেউ কেউ নামাজের সময় পতাকা ওড়ানো, উঁচু স্থানে আগুন জ্বালানো, ঘণ্টা বাজানো, শঙ্খ বাজানো ইত্যাদি প্রস্তাব করলেন। কিন্তু খ্রিষ্টানরা গির্জায় ঘণ্টা বাজায়, ইহুদিরা শঙ্খ বাজায় এবং অগ্নি উপাসকরা তাদের উপাসনালয়ে আগুন জ্বালিয়ে থাকে। এসব প্রস্তাব রাসূল (সা.)-এর মনঃপূত হলো না। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেদিনের সভা শেষ হলো। সেই সভায় বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জায়েদ (রা.) উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে বাড়িতে ফিরে তিনি এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-

“সভা শেষে বাড়িতে গিয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, নামাজের আহ্বানের জন্য কোন পদ্ধতিটি উত্তম হবে? এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি রাতে ঘুমিয়ে পড়ি। আমি স্বপ্নে দেখলাম-একজন সবুজ পোশাক পরিহিত আগন্তুকের হাতে একটি ঘণ্টা রয়েছে। আমি তাকে বললাম, ‘হে আল্লাহর বান্দা! আপনি কি ঘণ্টাটি বিক্রি করবেন’ তিনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এটা দিয়ে কী করবে’ আমি বললাম, ‘আমি তা বাজিয়ে মুসলমানদের নামাজের জন্য আহ্বান করব।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম ও কার্যকর পন্থা শিখিয়ে দেব?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই!’ তিনি বললেন, ‘আমি যা যা বলছি, তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে তাই বল ও স্মরণ রাখ। প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্ত হলে এ কালামগুলো যথাসাধ্য উচ্চস্বরে উচ্চারণ করবে।’ অতঃপর তিনি এ কালামগুলো বলা শুরু করলেন এবং আমিও তার সঙ্গে সঙ্গে তা বলতে লাগলাম। আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র একবার পাঠ করার পরই তা আমার মুখস্থ হয়ে যায়! সে কালামগুলো ছিল-

আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! (আল্লাহ্ মহান! আল্লাহ্ মহান!) আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! (আল্লাহ্ মহান! আল্লাহ্ মহান!) আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই!) আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই!) আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল!) আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল!) হাইয়্যা আলাস সালাহ্! (নামাজের জন্য এসো!) হাইয়্যা আলাস সালাহ্ (নামাজের জন্য এসো!) হাইয়্যা আলাল ফালাহ্! (কল্যাণের জন্য এসো!) হাইয়্যা আলাল ফালাহ্! (কল্যাণের জন্য এসো!) আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! (আল্লাহ্ মহান! আল্লাহ্ মহান!)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্! (আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই!)

অতঃপর আগন্তুক অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং আমারও ঘুম ভেঙে গেল। তখন ফজর নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি তৎক্ষণাৎ রাসূল (সা.)-এর কাছে ছুটে গেলাম এবং স্বপ্নে যা দেখেছি ও শুনেছি, তা সবই আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে জানালাম। কালামগুলো তখন আমার খুব ভালোভাবেই স্মরণ ছিল। রাসূল (সা.) বললেন, ‘নিশ্চয়ই এটি সত্য স্বপ্ন! তুমি এখনি বেলালের কাছে যাও এবং যা যা শুনেছ, তা তাকে শিখিয়ে দাও। সে উচ্চস্বরে এ কালামের মাধ্যমে নামাজিদের আহ্বান করুক। কেননা, তার গলার স্বর তোমার চেয়ে অনেক উঁচু।’ আমি হজরত বেলাল (রা.)-এর কাছে গিয়ে তা তাকে শিখিয়ে দিলাম। তিনি মসজিদে এসে উচ্চস্বরে আজান দিলেন।’ (আল-কাউসার প্রকাশনী কর্তৃক অনূদিত সিরাতে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা ইদ্রীস কান্ধলবী (রহ.), পৃষ্ঠা ২৯৭ ও ২৯৮)।

হজরত উমর (রা.) সেসময় বাড়িতে ছিলেন। তিনি আজান শুনে জেগে উঠলেন এবং অতিদ্রুত তার চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা.)! সেই পবিত্র সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য নবী করে প্রেরণ করেছেন, নিশ্চয়ই আবদুল্লাহ্ ইবনে জায়েদকে যা দেখানো হয়েছে, আমিও ঠিক তাই স্বপ্নে দেখেছি ও শুনেছি। এ কথা শুনে রাসূল (সা.) বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই।’ (মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফের ইতিহাস, মওলানা রশিদ আহমদ, পৃষ্ঠা ১৩২।)

এভাবেই প্রথম হিজরিতে ইসলামের ইতিহাসে আজানের প্রচলন শুরু হয়। সেদিন থেকেই রাসূল (সা.)-এর আদেশে হজরত বেলাল (রা.) মসজিদে নববীর স্থায়ী ‘মুয়াজ্জিন’ নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে হজরত বেলাল (রা.) একদিন ফজরের নামাজের আজান দেওয়ার সময় ‘হাইয়া আলাল ফালাহ!’-এরপর ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম!’ অর্থাৎ ‘ঘুম থেকে নামাজ উত্তম!’ এ বাক্যটি যোগ করেন। রাসূল (সা.) হজরত বেলাল (রা.)-এর এ সংযোজনকে কবুল করে নেন। (ই. ফা. বা. কর্তৃক অনূদিত সুনানু ইবনে মাজাহ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা ২৮৪, হাদিস নং ৭১৬; কালান্তর প্রকাশনী কর্তৃক অনূদিত সিরাতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ২৯)।

প্রকৃতপক্ষে, আজান হলো মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে উপস্থিত হওয়ার এক পবিত্র আমন্ত্রণ। মুয়াজ্জিন যখন আজানের সুরে সেই চিরন্তন আহ্বান জানান, তখন নামাজ আদায়ের মাধ্যমে সেই ডাকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই হলো একজন মুমিনের পক্ষ থেকে দেওয়া আজানের শ্রেষ্ঠ জবাব। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের মাধ্যমে এ পবিত্র আহ্বানে সাড়া দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন। [নিবন্ধটি লেখক কর্তৃক লিখিত স্মৃতি মোবারক : হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ও আহলে বাইতের জীবনী নামক গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত।]

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

পোস্টটি আপনার স্যোশাল মিডিয়াতে শেয়ার করুন

আপডেট এর সময় : ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬
১৯ বার পঠিত হয়েছে

ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম এক অনন্য ও সুমধুর ঐতিহ্যের নাম হলো ‘আজান’

আপডেট এর সময় : ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২৬

অনলাইন ডেস্ক:   ইসলামি সংস্কৃতির অন্যতম এক অনন্য ও সুমধুর ঐতিহ্যের নাম হলো ‘আজান’। ‘আজান’ আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো-আহ্বান করা, ঘোষণা করা। আজান শুধু নামাজের সময় জানিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম, তা কিন্তু নয়; বরং মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য ঘোষণা। আজানের যে চিরন্তন ধ্বনি প্রতিদিন আমাদের হৃদয়ে প্রশান্তি বিলায়, তার সূচনার ইতিহাস যেমন চমৎকার, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ। তাইতো মহাকবি কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১ খ্রি.) তার বিখ্যাত ‘আজান’ কবিতায় আজানের সুমধুর ধ্বনি ও আধ্যাত্মিক মহিমাকে তুলে ধরে লিখেছেন-

‘হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,

কী যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-

কত সুধা আছে সেই মধুর আজানে!’

আসুন তবে জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কীভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে আজানের এ পবিত্র প্রবর্তন হয়েছিল-

মদিনায় মসজিদে নববী নির্মাণের পর হজরত রাসূল (সা.)-এর ইমামতিতে সাহাবিরা প্রতি ওয়াক্ত জামাতে নামাজ আদায় করতেন; কিন্তু সেসময় ঘড়ির প্রচলন না থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অসুবিধা দেখা দিল। রাসূল (সা.) এ সমস্যা সমাধানের জন্য সাহাবিদের নিয়ে পরামর্শ সভার আহ্বান করলেন। সভায় সাহাবিদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব এলো। কেউ কেউ নামাজের সময় পতাকা ওড়ানো, উঁচু স্থানে আগুন জ্বালানো, ঘণ্টা বাজানো, শঙ্খ বাজানো ইত্যাদি প্রস্তাব করলেন। কিন্তু খ্রিষ্টানরা গির্জায় ঘণ্টা বাজায়, ইহুদিরা শঙ্খ বাজায় এবং অগ্নি উপাসকরা তাদের উপাসনালয়ে আগুন জ্বালিয়ে থাকে। এসব প্রস্তাব রাসূল (সা.)-এর মনঃপূত হলো না। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই সেদিনের সভা শেষ হলো। সেই সভায় বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে জায়েদ (রা.) উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে বাড়িতে ফিরে তিনি এক আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখেন, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন-

“সভা শেষে বাড়িতে গিয়ে আমি ভাবতে লাগলাম, নামাজের আহ্বানের জন্য কোন পদ্ধতিটি উত্তম হবে? এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ভাবতে আমি রাতে ঘুমিয়ে পড়ি। আমি স্বপ্নে দেখলাম-একজন সবুজ পোশাক পরিহিত আগন্তুকের হাতে একটি ঘণ্টা রয়েছে। আমি তাকে বললাম, ‘হে আল্লাহর বান্দা! আপনি কি ঘণ্টাটি বিক্রি করবেন’ তিনি আমার কথার উত্তর না দিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এটা দিয়ে কী করবে’ আমি বললাম, ‘আমি তা বাজিয়ে মুসলমানদের নামাজের জন্য আহ্বান করব।’ তখন তিনি বললেন, ‘আমি কি তোমাকে এর চেয়ে উত্তম ও কার্যকর পন্থা শিখিয়ে দেব?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই!’ তিনি বললেন, ‘আমি যা যা বলছি, তুমি আমার সঙ্গে সঙ্গে তাই বল ও স্মরণ রাখ। প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্ত হলে এ কালামগুলো যথাসাধ্য উচ্চস্বরে উচ্চারণ করবে।’ অতঃপর তিনি এ কালামগুলো বলা শুরু করলেন এবং আমিও তার সঙ্গে সঙ্গে তা বলতে লাগলাম। আশ্চর্যের বিষয়, মাত্র একবার পাঠ করার পরই তা আমার মুখস্থ হয়ে যায়! সে কালামগুলো ছিল-

আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! (আল্লাহ্ মহান! আল্লাহ্ মহান!) আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! (আল্লাহ্ মহান! আল্লাহ্ মহান!) আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই!) আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই!) আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল!) আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্! (আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল!) হাইয়্যা আলাস সালাহ্! (নামাজের জন্য এসো!) হাইয়্যা আলাস সালাহ্ (নামাজের জন্য এসো!) হাইয়্যা আলাল ফালাহ্! (কল্যাণের জন্য এসো!) হাইয়্যা আলাল ফালাহ্! (কল্যাণের জন্য এসো!) আল্লাহু আকবার! আল্লাহু আকবার! (আল্লাহ্ মহান! আল্লাহ্ মহান!)

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্! (আল্লাহ্ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই!)

অতঃপর আগন্তুক অদৃশ্য হয়ে গেলেন এবং আমারও ঘুম ভেঙে গেল। তখন ফজর নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আমি তৎক্ষণাৎ রাসূল (সা.)-এর কাছে ছুটে গেলাম এবং স্বপ্নে যা দেখেছি ও শুনেছি, তা সবই আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে জানালাম। কালামগুলো তখন আমার খুব ভালোভাবেই স্মরণ ছিল। রাসূল (সা.) বললেন, ‘নিশ্চয়ই এটি সত্য স্বপ্ন! তুমি এখনি বেলালের কাছে যাও এবং যা যা শুনেছ, তা তাকে শিখিয়ে দাও। সে উচ্চস্বরে এ কালামের মাধ্যমে নামাজিদের আহ্বান করুক। কেননা, তার গলার স্বর তোমার চেয়ে অনেক উঁচু।’ আমি হজরত বেলাল (রা.)-এর কাছে গিয়ে তা তাকে শিখিয়ে দিলাম। তিনি মসজিদে এসে উচ্চস্বরে আজান দিলেন।’ (আল-কাউসার প্রকাশনী কর্তৃক অনূদিত সিরাতে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা ইদ্রীস কান্ধলবী (রহ.), পৃষ্ঠা ২৯৭ ও ২৯৮)।

হজরত উমর (রা.) সেসময় বাড়িতে ছিলেন। তিনি আজান শুনে জেগে উঠলেন এবং অতিদ্রুত তার চাদরখানা গায়ে জড়িয়ে রাসূল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা.)! সেই পবিত্র সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য নবী করে প্রেরণ করেছেন, নিশ্চয়ই আবদুল্লাহ্ ইবনে জায়েদকে যা দেখানো হয়েছে, আমিও ঠিক তাই স্বপ্নে দেখেছি ও শুনেছি। এ কথা শুনে রাসূল (সা.) বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই।’ (মক্কা শরিফ ও মদিনা শরিফের ইতিহাস, মওলানা রশিদ আহমদ, পৃষ্ঠা ১৩২।)

এভাবেই প্রথম হিজরিতে ইসলামের ইতিহাসে আজানের প্রচলন শুরু হয়। সেদিন থেকেই রাসূল (সা.)-এর আদেশে হজরত বেলাল (রা.) মসজিদে নববীর স্থায়ী ‘মুয়াজ্জিন’ নিযুক্ত হন। পরবর্তীকালে হজরত বেলাল (রা.) একদিন ফজরের নামাজের আজান দেওয়ার সময় ‘হাইয়া আলাল ফালাহ!’-এরপর ‘আসসালাতু খায়রুম মিনান নাওম!’ অর্থাৎ ‘ঘুম থেকে নামাজ উত্তম!’ এ বাক্যটি যোগ করেন। রাসূল (সা.) হজরত বেলাল (রা.)-এর এ সংযোজনকে কবুল করে নেন। (ই. ফা. বা. কর্তৃক অনূদিত সুনানু ইবনে মাজাহ, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা ২৮৪, হাদিস নং ৭১৬; কালান্তর প্রকাশনী কর্তৃক অনূদিত সিরাতুন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা ২৯)।

প্রকৃতপক্ষে, আজান হলো মহান আল্লাহতায়ালার দরবারে উপস্থিত হওয়ার এক পবিত্র আমন্ত্রণ। মুয়াজ্জিন যখন আজানের সুরে সেই চিরন্তন আহ্বান জানান, তখন নামাজ আদায়ের মাধ্যমে সেই ডাকের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোই হলো একজন মুমিনের পক্ষ থেকে দেওয়া আজানের শ্রেষ্ঠ জবাব। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের মাধ্যমে এ পবিত্র আহ্বানে সাড়া দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন। [নিবন্ধটি লেখক কর্তৃক লিখিত স্মৃতি মোবারক : হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ও আহলে বাইতের জীবনী নামক গ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত।]

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ