যমুনার বুকে ‘মিনি কক্সবাজার’ সিরাজগঞ্জের চায়না বাঁধ
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: বাংলার পলল ভূমির বুক চিরে বয়ে চলা প্রমত্তা যমুনা একদিকে যেমন জনজীবন ও কৃষিতে আশীর্বাদ, অন্যদিকে বর্ষার ভাঙনে বহু জনপদ, বসতি ও স্থাপনার জন্য আতঙ্কের নাম। তবে সময়ের সঙ্গে নদীশাসন ও প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়নে যমুনার সেই রুদ্ররূপের অনেকটাই বদলে গেছে সিরাজগঞ্জে। ভাঙন প্রতিরোধে নির্মিত চায়না বাঁধ বা ক্রসবার-৩ এখন হয়ে উঠেছে জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্র।
সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই যমুনার সঙ্গে লড়াই করে আসছে মানুষ। নব্বইয়ের দশকে নদীর ভাঙনে শহর যখন অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন শুরু হয় নদীশাসনের বড় উদ্যোগ। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ব্রিটিশ কারিগরি সহায়তায় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানির মাধ্যমে নির্মাণ করা হয় মূল শহর রক্ষা বাঁধ। তবে এরপরও যমুনার ভাঙন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে নদীশাসনের আধুনিক উদ্যোগ হিসেবে ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে নির্মাণ করা হয় ক্রসবার-৩। প্রায় ৮০ থেকে ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি যমুনার বুক চিরে নির্মাণ করে ১ হাজার ৭৮২ মিটার দীর্ঘ এ বাঁধ। নির্মাণের পর থেকেই সাধারণ মানুষের কাছে এটি পরিচিতি পায় ‘চায়না বাঁধ’ নামে।
একসময় যে স্থাপনা ছিল মূলত নদীশাসন ও ভাঙন প্রতিরোধের অংশ, সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে উঠেছে প্রকৃতি উপভোগের অন্যতম স্থান। বাঁধের ওপর পিচঢালা সড়ক ধরে এগিয়ে গেলে দুই পাশে দেখা যায় যমুনার বিস্তীর্ণ জলরাশি। বিকেলের সোনালি আলোয় নদীর পানিতে তৈরি হয় মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দূরে দেখা যায় যমুনা সেতুর অবয়ব। নদী ও আকাশের মিলনমেলায় বদলে যায় পুরো পরিবেশ।
স্থানীয়দের কাছে চায়না বাঁধ এখন ‘মিনি কক্সবাজার’ নামেও পরিচিত। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। নদীর হাওয়া, ঢেউয়ের শব্দ এবং বিস্তীর্ণ জলরাশির দৃশ্য উপভোগ করতে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন মানুষ।
চায়না বাঁধের আরেকটি আকর্ষণ হলো বাঁধসংলগ্ন উইন্ডমিল বা বায়ুকল। যমুনার প্রবাহিত বাতাসকে কাজে লাগিয়ে স্থাপন করা এসব বিশাল বায়ুকল বাঁধের সৌন্দর্যে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা। বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঘুরতে থাকা বিশাল পাখাগুলো দর্শনার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে বাড়তি আকর্ষণ।
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় চায়না বাঁধের সৌন্দর্যও। বর্ষা শেষে যমুনার বুকে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ বালুচর। সেই চরের বুকজুড়ে ফুটে থাকা সাদা কাশফুল আর নীল আকাশ মিলে তৈরি করে মনোরম দৃশ্য। আবার বর্ষায় নদী যখন পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন বাঁধের দুই পাশে দেখা যায় বিস্তীর্ণ জলরাশি। তখন বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে মনে হয় যেন সাগরের বুকেই দাঁড়িয়ে আছেন দর্শনার্থীরা।
বাঁধের শেষ প্রান্তে রয়েছে নৌভ্রমণের সুযোগ। সেখানে সারি সারি ছোট-বড় নৌকা ও স্পিডবোট দেখা যায়। দর্শনার্থীরা নৌকায় চড়ে যমুনার বুকে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পান। মাঝনদীতে নৌকা চলার সময় নদীর বাতাস ও চারপাশের জলরাশি উপভোগ করেন তারা।
চায়না বাঁধের কাছেই রয়েছে ‘হার্ট ভিউ পয়েন্ট’। সেখান থেকে দূরে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু দেখা যায়। সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন ও যানবাহন চলাচলের দৃশ্যও উপভোগ করা যায়। রাতের বেলায় সেতুর আলোগুলো জ্বলে উঠলে নদীর পানিতে তৈরি হয় আলো-ছায়ার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চায়না বাঁধের পরিবেশ আরও জমজমাট হয়ে ওঠে। বাঁধের দুপাশে বসে বিভিন্ন খাবারের দোকান। চা, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি, ভেলপুরি ও ফিশ ফ্রাইসহ নানা ধরনের খাবারের পসরা নিয়ে বসেন বিক্রেতারা। নদীর বাতাস, পানির কলতান আর দর্শনার্থীদের আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
সিরাজগঞ্জের চায়না বাঁধ এখন শুধু নদীভাঙন প্রতিরোধের একটি অবকাঠামো নয়; এটি হয়ে উঠেছে মানুষের বিনোদন ও প্রকৃতি উপভোগের অন্যতম স্থান। নদীশাসনের প্রয়োজনে নির্মিত এই বাঁধ আজ যমুনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের নির্মাণশৈলীর এক অনন্য মেলবন্ধনের প্রতীক।




















